আসাদ বিন হাফিজের 'অনিবার্য বিপ্লবের ইশতেহার’র ঈগলপাঠ ।। আফসার নিজাম
আফসার নিজাম
আসাদ বিন হাফিজের লগে মোলাকাত হইবার আগেই তার সৃজন দুনিয়ার সাথে দেখা হইছে। তার কবিতা পাঠ আমারে বেশ আপ্লুত করছে। তার গান আমারে বন্দরে মাঝে আটকায়া রাখতে পারে নাই। ‘উড়ো জাহাজ উড়ো উড়ো রয়না বিমান বন্দরে।’ আমিও বন্দরে রই নাই। আশির দশকের আগে যখন বাংলাদেশ একটা আদর্শিক টানাপড়েনের মইধ্যে দিয়া যাইতাছিল, তখন বাংলা সাহিত্যের প্রধান কবিদের অনেকেই জীবন দর্শন বদলাইছে, কবি আল মাহমুদ তাদের মধ্যে অন্যতম। সেই সময় সৈয়দ আলী আহসান, আবদুল মান্নান সৈয়দ, আবদুস সাত্তার, দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, আফজাল চৌধুরী, আশরাফ সিদ্দিকীরাও জীবন দর্শন বদলাইছে। কমিউনিজমের সেকুলারিজম থেইকা ইসলামের সবুজ ছায়াতলে জীবনের মাকসদ খুঁইজা পাইছেন। তাগো সিলসিলাকে জিন্দা রাখার লাইগা একদল তরুণ তাগো লগে গাটছড়া বানছে। তাগো পথের দিশা লইয়া কবি মতিউর রহমান মল্লিক, আসাদ বিন হাফিজ, সোলায়মান আহসান, হাসান আলীমরা সাহিত্য সংস্কৃতির সমাজ আর রাজনীতির আমূল বদল নিয়া আইছিলেন। হিন্দুয়ানী সেকুলার ধর্মের বিপরীতে বাংলাদেশে আবার প্রাকৃতজনের জবানে নির্মাণ হইছিল ঐতিহ্যধারার নয়া কবিতা, গান আর সাংস্কৃতির বিভিন্ন অনুষ্ঠান। এই কাফিলার অন্যতম সৃজনকারিগর আছিলেন কবি আসাদ বিন হাফিজ।
আসাদ ১৯৫৮ সালের ১ জানুয়ারি গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ থানার বড়গাঁওয়ে পয়দা হইয়া ইহজীবনের সফর শেষ করার ২০২৪ সালের ১ জুলাই ফিরা গেলেন রবের কাছে। তিনি ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেইকা বাংলা সাহিত্যে ডিগ্রি লইয়া শিক্ষকতা আর সম্পাদনার মইধ্যে নিজেরে জড়াইয়া রাখছিলেন। আদর্শের জায়গা থেইকা আসাদ ছিলো আল্লামা ইকবাল, কাজী নজরুল ইসলাম আর ফররুখ আহমদের পথের যাত্রী। এই জন্য তার সাহিত্যে বাংলার মুসলিম সমাজের আত্মপরিচয় আর বৈপ্লবিক পুনর্জাগরণের সুর বাইজা ওঠত। ব্যক্তিজীবনে লড়াকু কবি’র ১৯৯০ সালে যখন প্রথম বই 'কি দেখো দাঁড়িয়ে একা সুহাসিনী ভোর' বাইর হইলো, তখন লোকে তাকে চিনলো এক স্নিগ্ধ আর ঐতিহ্যমগ্ন কবি হিসেবে। নজরুল যেমন কইছিল ‘মোর এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতূর্য।’ সাক্ষাৎ নজরুলের মতো কোমল ও কঠিন হৃদয়ের সম্মিলত রূপ ছিল আসাদের। কিন্তু আসল কামডা হইলো ১৯৯৬ সালে যখন তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ 'অনিবার্য বিপ্লবের ইশতেহার' বাইর হইয়া বাংলা কবিতার আসরে এক তুলকালাম কাণ্ড ঘটাইয়া দিল। এই বইয়ের নামভূমিকায় থাকা কবিতাটি কেবল আসাদ বিন হাফিজের কাব্যজীবনের শ্রেষ্ঠ মিনার না, বরং আধুনিক বাংলা সাহিত্যের পুরা ইতিহাসে এক অনন্য ইনকিলাবী ইশতেহার হইয়া হাজির হইলো তমুদ্দুনের কাছে। এই দীর্ঘ কবিতায় কবি যে বিপ্লবের নকশা আঁকছেন, তা কোনো ক্ষমতার গদি বদলানোর লড়াই না; বরং তা মানুষের মনস্তত্ত্ব, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি আর রুহের আমূল বদলের এক সামগ্রিক দলিল।
কবিতার শুরুতেই কবি ‘জনগণকে আরেকটি অনিবার্য বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নেয়ার কথা বলছি!’ শুরু করছেন। এই বিপ্লবের জমিন তৈরি হইছে এমন এক অস্তিত্বের সংকট দিয়া, যেখান থেইকা ফেরার কোনো পথ নাই। কবি যখন বলেন, ‘দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে যেভাবে রুখে দাঁড়ায় আক্রান্ত দুর্বল/ বিধ্বস্ত জাহাজ যাত্রীরা আঁকড়ে ধরে ভাসমান পাটাতন/ তেমনি একাগ্রতা নিয়ে/ আমি আপনাদের আসন্ন বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নেয়ার কথা বলছি।’ তখন পষ্ট হয়া ওঠে, এই সংগ্রাম কোনো আকস্মিক উত্তেজনা বা বিলাসী রোমান্টিকতা না। এটা হইল অস্তিত্ব রক্ষার এক শেষ লড়াই। ওই যে ডুবন্ত জাহাজের যাত্রীদের কাঠের টুকরা আঁকড়ে ধরার উপমা, তা মানুষের চরম অসহায়ত্ব আর টিকে থাকার আদিম আকুলতার এক চরম ইশতিহার। কবি এই মনস্তাত্ত্বিক সত্যটারে ধইরা এক সর্বাত্মক সংগ্রামের আওয়াজ তুলছেন, যা জীবনের জন্য এক আমরণ লড়াই।
বিপ্লবের এই স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়া কবি একে যুদ্ধ, তিল তিল কইরা বাঁচা, আর রক্তপদ্ম বা কৃষ্ণচূড়ার সাথে মিলাইয়া ফেলছেন! ‘‘বিপ্লব মানে তিল তিল বাঁচতে শেখা/ বিপ্লব মানে ভাসমান রক্তপদ্ম, প্রস্ফুটিত কৃষ্ণচূড়া/ বিপ্লব মানে জীবন/ বিপ্লব মানে জীবনের জন্য আমরণ লড়াই।’ যা ওই রক্তপদ্ম বা কৃষ্ণচূড়ার লাল আভায় প্রতীকী রূপ নিছে। কবি বুঝাইতে চাইছেন, সংগ্রাম এবং নান্দনিকতা একে অপরের পরিপূরক। বিপ্লবের জন্য সমাজের প্রথাগত আবেগ আর প্রাত্যহিক জীবনের রূপান্তর ঘটে। এই নতুন সমাজে ‘প্রতিটি যুবক/ নারীর বাহুর পরিবর্তে স্বপ্ন দেখে উত্তপ্ত মেশিনগানের/ আর রমনীরা/ সুগন্ধি রুমালের পরিবর্তে পুরুষের হাতে তুলে দেয়/ বুলেট, গ্রেনেড।’ এই পঙতিতে পারিবারিক আবেগের উপরে আদর্শিক আর সামাজিক দায়িত্বের এক চরম অগ্রাধিকার কায়েম করা হয়। নারীর কোমলতা আর পুরুষের পৌরুষ মিলাইয়া প্রতিরক্ষার এক কঠিন প্রাচীর গইড়া তোলে।
আসাদের এই কাঙ্ক্ষিত বিপ্লবের তামান্না কেবল বাইরের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন না, বরং মানুষের অভ্যন্তরীণ নৈতিক পুনর্গঠন। কবি বিশ্বাস করেন, ‘‘যে বিপ্লব সাধিত হলে মানুষের শরীর থেকে/ খসে পড়ে শয়তানের লেবাস/ জল্লাদের অশান্ত চিত্তে জন্ম নেয় বসরাই গোলাপ।’ জল্লাদের মতো নির্মম হৃদয়ে গোলাপের মতো কোমল অনুভূতির জন্ম হওয়ার এই রূপকটা প্রমাণ করে, এই বিপ্লব কোনো প্রতিশোধের উৎসব না, বরং মানবাত্মার এক মহৎ সংশোধন। এর পরপরই কবি ইসলামী সুশাসনের সেই শাশ্বত ঐতিহাসিক আদর্শকে প্রাসঙ্গিক কইরা তোলেন। তিনি এমন এক দুর্দান্ত শাসকের ছবি আঁকেন, যিনি ‘‘অর্ধ পৃথিবীর দুর্দান্ত শাসক/ কেঁপে উঠে ফোরাত কূলের কোন/ অনাহারী কুকুরের আহার্য চিন্তায়।’’ এটা হইলো গিয়া দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর রা.-এর সেই বিখ্যাত শাসনদর্শনের ইশারা, যা রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা ও মানবিক মূল্যবোধের সর্বোচ্চ পর্যায়কে নিদর্শন হিশাবে বর্তমানের জন্য হাজির করে।
এই বিপ্লবের অর্থনৈতিক নকশাটাও বৈপ্লবিক আর ও বৈষম্যহীন সাম্যের খুব কাছাকাছি, যার ভিত্তি আবার আধ্যাত্মিক আর ঐশী বিধানের ওপর খাঁড়া। কবি দেখাইছেন, ‘যে বিপ্লব সাধিত হলে/ কন্যা হন্তারক অভাবী পিতাদের জন্য পরওয়ারদিগার/ খুলে দেন রহমতের সব ক'টি বদ্ধ দুয়ার।’ দারিদ্র্যের কারণে জাহেলি যুগের মতো, কিংবা আধুনিক যুগের চরম সংকটে কন্যা সন্তানকে বোঝা মনে করার যে নিষ্ঠুরতা, তার অবসান হইবো। ‘তখন কোন অভাব আর অভাব থাকে না/ উদ্বৃত্ত সম্পদ প্রদানের জন্য/ পাওয়া যায় না কোন ক্ষুধাতুর বনি আদম।’ এটা ইসলামের স্বর্ণযুগের সেই জাকাতভিত্তিক অর্থনীতির এক ঐতিহাসিক রূপকল্প, যা ইনসাফ ভিত্তিক রাষ্ট্র কাঠামের প্রতিচ্ছবি। কবি এখানে পুঁজিবাদী শোষক ব্যবস্থার বিপরীতে এক কল্যাণকামী ঐশী অর্থনীতির ইশতেহার হাজির করছেন।
কবিতার গতি ঠিক রাখার জন্য কবি সময় আর প্রকৃতির কিছু পরাবাস্তব আর মহাজাগতিক রূপকও খাটাইলেন। তিনি লিখছেন, ‘অন্ধকার যত ঘনীভূত হয় ততই উজ্জ্বল হয় বিপ্লবের সম্ভাবনা/ একটি কৃষ্ণ অন্ধকার মানেই/ সামনে অপেক্ষমান একটি প্রস্ফুটিত সূর্যোদয়’। কুচকুচে অন্ধকার যেমন সূর্যোদয়ের আগমনী বার্তা, রক্তিম সন্ধ্যা যেমন বেগবান বোরাক চেপে ধেয়ে আসা সকালের পূর্বাভাস, তেমনি ‘একটি মিথ্যা মানেই/ তাকে ধাওয়া করছে কোন দ্রুতগামী সত্যাস্ত্র/ একটি অবাধ্য সমাজ মানেই/ সামনে নূহের প্লাবন, অনাগত ধ্বংস’। আর তখন তিনি ‘আরেকটি নতুন সভ্যতার আমূল উদ্বোধন’র স্বপ্ন দেখান। দিন, রাত, ঋতুচক্র আর বছরের প্রতিটি ঘূর্ণিপাকে কবি সেই অনিবার্য বিপ্লবের অশ্বখুরধ্বনি শুনতে পান। এই মহাজাগতিক অনিবার্যতা শোষিত মানুষকে আশাবাদী কইরা তোলে, আর অভয় বাণী দেন- ‘অন্ধকার যত ঘনীভূত হয় ততই উজ্জ্বল হয় বিপ্লবের সম্ভাবনা।’
কবি তার জনগণকে বুকের ভেতর সারাক্ষণ বিপ্লবের চাষবাস করার ডাক দিছেন। বিপ্লবরে চাষাবাদের লগে তুলনা করাটা কিন্তু বড়ই তাৎপর্যপূর্ণ; কারণ, চাষের লাইগা যেমন জমি চাষ, বীজ রোপণ, যত্ন-আত্তি আর সঠিক মৌসুমের দরকার হয়, বিপ্লবের লাইগাও তেমন দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক আর আদর্শিক প্রস্তুতির প্রয়োজন। ‘যে বিপ্লবের চাষ করলে/ নীলনদের আহার্য হয় অবাধ্য ফারাও/ আবরাহার হাতি হয় পাখির খোরাক/ চুরমার হয়ে যায় রোম ও পারস্যের বিশাল সালতানাতের দাম্ভিক চূড়া।/ ব্যর্থ হয়ে যায় কারুণের ধন/ কল্পিত স্বর্গদ্বারে হুমড়ি খেয়ে পড়ে থাকে/ অবাধ্য সাদ্দাতের দশটি আঙ্গুল।/ আর কারাগারের কয়েদী বন্দী ইউসুফ/ কুদরতের ইশারায় রাজ মুকুট পরে হয়ে যান বাদশা কেনান।’ এই চাষাবাদ যখন সফল হয়, তখনই প্রাচীন ও আধুনিক ইতিহাসের যত খোদাদ্রোহী, অত্যাচারী আর অহংকারী শক্তির শান-শওকত ধূলিসাৎ হইয়া পড়ে।
আসাদের বিপ্লব কিন্তু খালি বাইরের কোনো দুশমনের লগে সংগ্রাম করে না, এইডা হইলো মানুষের অন্তরের যত পঙ্কিলতা আর মলিনতার বিরুদ্ধে এক আজন্ম সংগ্রাম। কবি পরিষ্কার কইরা দিছেন, ‘যেখানে অন্ধকার সেখানেই বিপ্লব/ যেখানে ক্লেদাক্ত পাপ ও পঙ্কিলতার সয়লাব/ সেখানেই বিপ্লব/ যেখানে নগ্নতা ও বেহায়াপনার যুগল উল্লাস/ সেখানেই বিপ্লব/ যেখানে মিথ্যার ফানুস/ সেখানেই বিপ্লব/ যেখানে শোষণ ও সূদের অক্টোপাশ ক্যান্সার’ আছে, সেইখানেই বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা অনিবার্য। এইখানে 'শোষণ ও সুদের অক্টোপাস ক্যান্সার' কথাডা দিয়া কবি পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে তার তীব্র ক্ষোভের জানান দিছেন। একই লগে কবি মনে করাইয়া দেন যে, বিপ্লবের আসল কাম খালি বাইরের জালিমরে ধ্বংস করা না, বরং নিজের ‘অন্তরের প্রতিটি কুচিন্তা আর কুকর্মের বিরুদ্ধে’ ফাইট করা। এইডা হইলো একই লগে নিজের কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে আত্মশুদ্ধির লড়াই আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন।
বিপ্লবের লাইগা খালি আবেগ দিয়া কাম চলে না, এর লাইগা দরকার সঠিক রণকৌশল আর ইতিহাসের মোক্ষম মুহূর্তের পরিপক্বতা। কবি একে বিপ্লবের 'মৌসুম' হিসেবে ডাকছেন। তিনি চমৎকার প্রাকৃতিক রূপক দিয়া দেখাইছেন যে, ‘মৌসুম ছাড়া কোন বসন্ত আসে না, বর্ষা আসে না/ মৌসুম ছাড়া ফোটে না কৃষ্ণচূড়া, পলাশ, শিমুল/ সময়কে ধারণ করতে না পারলে গর্ভবতী হয় না কোন রমনী’। ঠিক তেমনি সঠিক সময় আর সুযোগরে কাজে লাগাইতে না পারলে বিপ্লবের এই পবিত্র দায়িত্ব কখনোই সফল হওয়ার না। এই অংশটা প্রমাণ করে, আসাদ খালি ভাবালু কোনো কবি না, বরং তিনি এক পোড় খাওয়া বিপ্লবী চিন্তাবিদ, যিনি দীর্ঘ প্রস্তুতি আর ইতিহাসের সঠিক মুহূর্তের সমীকরণরে বিপ্লবের পূর্বশর্ত মাইনা সামনে আগাইয়া যান।
কবিতার শেষভাগে আইসা এই বিপ্লব এক বিশাল বৈশ্বিক আর ভূরাজনৈতিক চেহরা ধারণ করে। বিংশ শতাব্দীর বিদায়লগ্নে খাড়াইয়া কবি দেখতাছেন, কেমনে সাইবেরিয়ার বরফে পাশবতন্ত্র মুখ লুকাইতেছে আর আমেরিকার ঔদ্ধত্যরে আল্লাহর গজব চারপাশ দিয়া ঘেরাও করতাছে। ‘ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, বসনিয়া, কাশ্মীর, পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তরে/ লাউডস্পীকারের সামনে দাঁড়িয়ে গেছে যুগের মুয়াজ্জিন/ আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে এখনি আজান হবে/ সে আওয়াজের নিচে হারিয়ে যাবে/ এটম ও কামানের ধ্বনি’। এই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে বিজয়ের লাইগা কবি কোনো বৈষয়িক অস্ত্রের ওপর ভরসা করেন নাই, বরং এক এশি আর পরাবাস্তব বিজয়ের বয়ান দিছেন। সেইখানে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত কইরা আজান হইব, যার শব্দের নিচে হারাইয়া যাইব পারমাণবিক বোমার গর্জন। ওজুর পানিতে ভিইজা অকেজো হইয়া পড়ব দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, আবাবিল পাখি গিলে খাইব আকাশের বোমারু বিমান, আর সাদা কবুতরের ডানায় আটকা পইড়া বন্ধ হইয়া যাইব পারমাণবিক ঝড়। এই দৃশ্যকল্পগুলা আপাতদৃষ্টিতে পরাবাস্তব মনে হইলেও, এগুলা আসলে বিশ্বাসের অপরাজেয় শক্তির নান্দনিক রূপক। এইডা প্রমাণ করে, বস্তুগত পরাশক্তি যতই শক্তিশালী হোক না কেন, বিশ্বাসের আত্মিক শক্তির সামনে তা ধুলোয় মিশতে বাধ্য। এই রক্তাক্ত পথ পাড়ি দিয়া যখন বিজয় আইব, তখন ‘আর বেহেশ্ত থেকে শহীদেরা/ আপনাদের বিজয় অভিনন্দন জানানোর জন্য/ মার্চপাস্ট করতে করতে এসে দাঁড়িয়ে যাবে রাস্তার দু'পাশে’।
বাংলা সাহিত্য সমালোচনা আর তাত্ত্বিক আঙিনায় 'অনিবার্য বিপ্লবের ইশতেহার' কবিতাটা লইয়া একটা বড়সর বিতর্ক আছে। অনেকে মনে করেন, এইডা কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর বিখ্যাত 'আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি' কবিতার সরাসরি অনুকরণ। এই ধরনের অনুকরণ বাংলাসাহিত্যে বেশ মশহুর। চারণকবি গগণ হরকরা’র ‘আমি কোথায় পাবো তারে আমার মনের মানুষ যেরে’ এর অনুকরণে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’র মতো বিখ্যাত গান। এইখানে কবিতার ঢং মানে প্যাটর্ন ছন্দ ঠিক রাইখা নিজের দর্শন উপস্থাপন করা হয়। বাংলার বাউল গানের এর অহরহ প্রমাণ পাওয়া যায়। সেই খানে সুর, তাল, লয়, ছন্দ ও প্যাটার্ন মুখ্য হইয়া দেখা দেয় না। মূখ্য হইয়া দেখা দেয় ভাব আর ভাষা। তেমনি আসাদ ও ওবায়দুল্লাহর কবিতার গঠনশৈলী, দীর্ঘ পঙ্ক্তির ব্যবহার আর বারবার ফিরে আসা মূল চরণের কাঠামোগত সুরে বাহ্যিক মিল আছে, কিন্তু তাগো দার্শনিক ভিত্তি আর গন্তব্য একদম উল্টা মেরুতে। ওবায়দুল্লাহর কবিতাটা মূলত বাংলাদেশর আত্মপরিচয়, ভূমি, কৃষি ঐতিহ্য আর অতীতের রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের রোমন্থন, যা এক ধরণের শান্ত আর নান্দনিক মুক্তির কথা কয়। অন্যদিকে, আসাদের কবিতা অতীতচারী না হইয়া বরং তা ভবিষ্যৎমুখী আর ঐশী শাসন প্রতিষ্ঠার লাইগা চূড়ান্ত। যার মাকসাদ হইল প্রত্যক্ষ বিপ্লবের ইশতেহার। ওবায়দুল্লাহর কবিতা নিজেই এক ধরণের আধ্যাত্মিক মুক্তি, আর আসাদদের কবিতা হইলো বিপ্লব। যা বিদ্যমান সমাজরে শয়তানি লেবাস আর সেকুলার রাজনীতি ও অর্থনীতির ক্যান্সার থেইকা মুক্ত করার হাতিয়ার। তাই এই দুই কবিতার শৈল্পিক আর তাত্ত্বিক মেরুকরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন।
'অনিবার্য বিপ্লবের ইশতেহার' কিতাবটি সামগ্রিকভাবে তাফসির করলে এর নান্দনিক ভারসাম্য আর কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যের কিছু অনন্য দিক চোখে পড়ে। এই দীর্ঘ কবিতাটা অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন বাংলাদেশের জনগণের চিন্তার প্রতিফলন ঘটানর কারণে। ভাষা ছন্দ অলংকারের কারণে আসাদ বিন হাফিজ বাংলা সাহিত্যে চিরকাল অনিবার্য হইয়া থাকবেন। তিনি এই একটা কবিতার মাধ্যমেই তার নিজের কাব্যিক সীমানারে অতিক্রম কইরা গেছেন। শেষমেশ এইটাই বলা যায়, বিশ্বাসের শক্তিতে বলীয়ান শোষিত মানবতার মুক্তির এক কালজয়ী ইশতেহার।
অনিবার্য বিপ্লবের ইশতেহার
কবি আসাদ বিন হাফিজ
আমি আমার জনগণকে আরেকটি অনিবার্য বিপ্লবের জন্য
প্রস্তুতি নেয়ার কথা বলছি
দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে যেভাবে রুখে দাঁড়ায় আক্রান্ত দুর্বল
বিধ্বস্ত জাহাজ যাত্রীরা আঁকড়ে ধরে ভাসমান পাটাতন
তেমনি একাগ্রতা নিয়ে
আমি আপনাদের আসন্ন বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নেয়ার কথা বলছি।
বিপ্লব মানেই যুদ্ধ
বিপ্লব মানে তিল তিল বাঁচতে শেখা
বিপ্লব মানে ভাসমান রক্তপদ্ম, প্রস্ফুটিত কৃষ্ণচূড়া
বিপ্লব মানে জীবন
বিপ্লব মানে জীবনের জন্য আমরণ লড়াই।
আমি আপনাদেরকে আরেকটি অনিবার্য বিপ্লবের জন্য
প্রস্তুতি নেয়ার কথা বলছি
যে বিপ্লবে প্রতিটি নাগরিকের জীবন হয়
একেকজন যোদ্ধার জীবন
প্রাপ্তবয়স্ক প্রতিটি মানুষ হয়
একেকজন আমূল বিপ্লবী
প্রতিটি যুবক
নারীর বাহুর পরিবর্তে স্বপ্ন দেখে উত্তপ্ত মেশিনগানের
আর রমনীরা
সুগন্ধি রুমালের পরিবর্তে পুরুষের হাতে তুলে দেয়
বুলেট, গ্রেনেড।
আমি আমার জনগণকে
অনিবার্য সেই বিপ্লবের জন্য
প্রস্তুতি নেয়ার কথা বলছি।
বিপ্লব মানেই যুদ্ধ
বিপ্লব মানেই সংগ্রাম, সংঘাত
বিপ্লব মানে শিরায় শিরায় উদ্দাম ঝড়
ঝড়ো হাওয়া, টর্নেডো, সাইক্লোন
বিপ্লব মানে কল্লোলিত সমুদ্রের শোঁ শোঁ অশান্ত গর্জন
বিপ্লব মানে আশা, সফলতা ও বিজয়ের অমোঘ পুষ্পমাল্য।
আমি আমার জনগণকে আরেকটি অনিবার্য বিপ্লবের জন্য
প্রস্তুতি নেয়ার কথা বলছি
যে বিপ্লব সাধিত হলে মানুষের শরীর থেকে
খসে পড়ে শয়তানের লেবাস
জল্লাদের অশান্ত চিত্তে জন্ম নেয় বসরাই গোলাপ
অর্ধ পৃথিবীর দুর্দান্ত শাসক
কেঁপে উঠে ফোরাত কূলের কোন
অনাহারী কুকুরের আহার্য চিন্তায়।
যে বিপ্লব সাধিত হলে
কন্যা হন্তারক অভাবী পিতাদের জন্য পরওয়ারদিগার
খুলে দেন রহমতের সব ক'টি বদ্ধ দুয়ার।
তখন কোন অভাব আর অভাব থাকে না
উদ্বৃত্ত সম্পদ প্রদানের জন্য
পাওয়া যায় না কোন ক্ষুধাতুর বনি আদম।
অন্ধকার যত ঘনীভূত হয় ততই উজ্জ্বল হয় বিপ্লবের সম্ভাবনা
একটি কৃষ্ণ অন্ধকার মানেই
সামনে অপেক্ষমান একটি প্রস্ফুটিত সূর্যোদয়
একটি আরক্ত সন্ধ্যা মানেই
বেগবান বোররাক চেপে ধেয়ে আসছে কোন কুসুম সকাল
একটি কৃষ্ণ মধ্যরাত মানেই
তার উল্টো পিঠে বসে আছে কোন মৌমাছি দুপুর
একটি মিথ্যা মানেই
তাকে ধাওয়া করছে কোন দ্রুতগামী সত্যাস্ত্র
একটি অবাধ্য সমাজ মানেই
সামনে নূহের প্লাবন, অনাগত ধ্বংস
আরেকটি নতুন সভ্যতার আমূল উদ্বোধন।
আমি আপনাদেরকে সেই
অনিবার্য বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নেয়ার কথা বলছি
দিন ও রাত্রির প্রতিটি আবর্তনে
শোনা যায় যে বিপ্লবের অশ্বখুরধ্বনি
ঋতুচক্রের প্রতিটি আবর্তনে
শোনা যায় যে বিপ্লবের অশ্বখুরধ্বনি
মাস ও বৎসরের প্রতিটি ঘূর্ণিপাকে
শোনা যায় যে বিপ্লবের অশ্বখুরধ্বনি
যুগ ও কালের প্রতিটি ঘূর্ণিপাকে
শোনা যায় যে বিপ্লবের অশ্বখুরধ্বনি
শতাব্দীর প্রতিটি পরতে পরতে যে বিপ্লবের পলিময় মৃত্তিকা।
আমি আমার জনগণকে সারাক্ষণ বুকের মধ্যে
বিপ্লবের চাষ করতে বলছি
যে বিপ্লবের চাষ করলে
প্রজ্জ্বলিত অগ্নি হয় জাফরান বীথি
যে বিপ্লবের চাষ করলে
নীলনদের আহার্য হয় অবাধ্য ফারাও
আবরাহার হাতি হয় পাখির খোরাক
চুরমার হয়ে যায় রোম ও পারস্যের বিশাল সালতানাতের দাম্ভিক চূড়া।
ব্যর্থ হয়ে যায় কারুণের ধন
কল্পিত স্বর্গদ্বারে হুমড়ি খেয়ে পড়ে থাকে
অবাধ্য সাদ্দাতের দশটি আঙ্গুল।
আর কারাগারের কয়েদী বন্দী ইউসুফ
কুদরতের ইশারায় রাজ মুকুট পরে হয়ে যান বাদশা কেনান।
আমি আমার জনগণকে
আসন্ন সেই বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য উদাত্ত আহবান জানাচ্ছি।
যেখানে অন্ধকার সেখানেই বিপ্লব
যেখানে ক্লেদাক্ত পাপ ও পঙ্কিলতার সয়লাব
সেখানেই বিপ্লব
যেখানে নগ্নতা ও বেহায়াপনার যুগল উল্লাস
সেখানেই বিপ্লব
যেখানে মিথ্যার ফানুস
সেখানেই বিপ্লব
যেখানে শোষণ ও সূদের অক্টোপাশ ক্যান্সার
সেখানেই বিপ্লব
বিপ্লব সকল জুলুম, অত্যাচার আর নির্যাতনের বিরুদ্ধে
বিপ্লব অন্তরের প্রতিটি কুচিন্তা আর কুকর্মের বিরুদ্ধে।
আমি আপনাদের সকলকে
বিপ্লবের মৌসুমের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই।
মৌসুম ছাড়া কোন বসন্ত আসে না, বর্ষা আসে না
মৌসুম ছাড়া ফোটে না কৃষ্ণচূড়া, পলাশ, শিমুল
সময়কে ধারণ করতে না পারলে গর্ভবতী হয় না কোন রমনী
ফলবতী হয় না সবুজ ধানের শীষ
সীম আর মটরদানা
সময়কে ধারণ করতে না পারলে সফল হয় না বিপ্লবের আরাধ্য কাজ।
কৃষ্ণ মধ্যরাত পেরিয়ে আজ বিংশ শতাব্দী ছুটছে প্রত্যুষের দিকে
সাইবেরিয়ার বরফ খন্ডে মুখ লুকোচ্ছে পাশবতন্ত্র
আ'দ ও সামুদ জাতির মত টেক্সাসের ঘোড়াগুলোকে
ঘিরে ফেলেছে আল্লাহর গজব।
ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, বসনিয়া, কাশ্মীর, পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তরে
লাউডস্পীকারের সামনে দাঁড়িয়ে গেছে যুগের মুয়াজ্জিন
আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে এখনি আজান হবে
সে আওয়াজের নিচে হারিয়ে যাবে
এটম ও কামানের ধ্বনি
গড়িয়ে যাওয়া অজুর পানিতে ভিজে অকেজো হয়ে পড়বে
সব ক'টি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র।
আবাবিল পাখির ঝাঁক গিলে খাবে আকাশ ফড়িং
রাজহাঁসগুলো শামুকের পরিবর্তে গিলে খাবে জীবন্ত টর্পেডো
সাদা কবুতরের পাখনায় আটকা পড়ে
থেমে যাবে আনবিক ঝড়
আর বেহেশ্ত্ থেকে শহীদেরা
আপনাদের বিজয় অভিনন্দন জানানোর জন্য
মার্চপাস্ট করতে করতে এসে দাঁড়িয়ে যাবে রাস্তার দু'পাশে।
তাদের প্রত্যেকের হাতে থাকবে একটি করে রক্ত গোলাপ
সজীব ও তরতাজা
চিত্তহারী ঘ্রাণময়
আমি আপনাদের সেই আনন্দিত
অনিবার্য বিপ্লবের পতাকা উত্তোলনের জন্য উদাত্ত আহবান জানাচ্ছি।
কোন মন্তব্য নেই