শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের জলরঙের জীবন ।। আফসার নিজাম
শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের জলরঙের জীবন
আফসার নিজাম
আমি তো শিল্পাচার্য মুস্তাফা মনোয়ারের নাকোল গেরামের উঠানে কোনোদিন খালি পায়ে হাঁটি নাই, আবার তার লগে বসে আড্ডাও মারি নাই। তবু এই দেশের শিল্প-সংস্কৃতির ময়দানে যেই কজন মানুষ নিজের সৃজশীলতা দিয়া একখান আলাদা জগৎ গইড়া গেছেন, মুস্তাফা মনোয়ার তাদের মধ্যে এমন এক নাম, যে নাম শুনলেই অন্তরডা কেমন জানি নরম হইয়া যায়। মনে হয়—আহা, এই মানুষডা না থাকলে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক চেহরাডা বোধহয় এতটা রঙিন, এতটা জিন্দাদিল হইতো না।
বাংলাদেশের চিত্রশিল্পী তো অনেকই আইছেন-গেছেন। কিন্তু এমন শিল্পী কয়জন পয়দা হইছে, যিনি এক হাতে তুলি, আরেক হাতে পাপেট; একদিকে রাগসংগীত, আরেকদিকে টেলিভিশনের ক্যামেরা; কখনো নাট্যনির্দেশক, কখনো ভাস্কর, আবার কখনো সাংস্কৃতিক সংগঠক হইয়া গোটা জাতির কল্পনাশক্তিরে নাড়া দিছেন? মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন সেই বিরল কিসিমের মানুষ; তিনি খালি ছবি আঁকেন নাই; বরং শিল্পকলার নন্দনতত্ত্বর খাস মেজাজটারে পাপেট, টেলিভিশন আর গণমাধ্যমের গাড়িতে চইড়া সাধারণ মানুষের দরজায় দরজায় পৌঁছাইয়া দিছেন। তার শিল্পচর্চা শুধু চোখের আরাম আছিল না; এইডা আছিল বাংলাদেশীদের আত্মপরিচয়, জাতীয়তাবাদ আর জুলুম-শোষণের বিরুদ্ধে এক নান্দনিক মুকাবিলা।
১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর, তৎকালীন যশোর জেলার মাগুরা মহকুমার শ্রীপুর থানার নাকোল গেরামের নানাবাড়িতে পয়দা হন মুস্তাফা মনোয়ার। তবে তাগো আদি বাড়ি আছিল ঝিনাইদহের শৈলকূপার মনোহরপুরে। তার বাবা কবি গোলাম মোস্তফা বাংলা সাহিত্যের এক বরেণ্য সিপাহসালার। ছোটবেলা থেইকাই তাই ঘরের বাতাসে বইয়ের গন্ধ, কবিতার সুর আর সাহিত্যিক মজলিসের আবহ বিরাজ করতো। শিল্পের বীজটা তাই তার রক্তের লগেই আইছিল।
সৃজনশীলতার এই চর্চা কেবল মুস্তাফা মনোয়ারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছিল না। গোটা খানদানটাই যেন একখান সাংস্কৃতিক খানকাহ। মেজভাই মুস্তফা আজিজ ছবি আঁকা আর বাবার আলোকচিত্র চর্চা ও বইয়ের অলঙ্করণ দেইখা তিনি শৈশবেই শিল্পের নানা মাধ্যমের প্রতি আকৃষ্ট হন। ছোটভাই মোস্তফা ফারুক পাশা দ্যাশের প্রথম পিয়ানোবাদক। যিনি লন্ডনের রয়্যাল কলেজ অব মিউজিক থেইকা শিক্ষা নিয়া দেশে শাস্ত্রীয় সংগীতের ভিত গড়ছেন। ভাগ্নে সৈয়দ মাইনুল হোসেন নির্মাণ করছেন সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ, আর বোনের নাতি নাফিস বিন জাফর হন প্রথম বাংলাদেশি অস্কারজয়ী সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ও অ্যানিমেটর। বুঝতেই পারতাছেন, এই পরিবারে শিল্প-সাহিত্যের স্রোত রক্তের লগেই বইতো। এই সমৃদ্ধ পারিবারিক ঐতিহ্যই মুস্তাফা মনোয়ারকে শিল্পের বহুমাত্রিক শাখায় বিচরণ করবার অনুপ্রেরণা জুগায়ছিল।
মুস্তাফা মনোয়ারে শৈশবের একেবারে গোড়ার দিনগুলা কাটছে গেরামের মুক্ত প্রকৃতির কোলে। উন্মুক্ত মাঠ, বহমান নদী, খোলা আকাশ আর দিগন্তবিস্তৃত সবুজের জলরং ছবি তার অন্তরে এমনভাবে গাঁথা পড়ছিল, পরবর্তী জীবনে তার তুলির প্রধান রঙ হইয়া ওঠে গ্রামীণ বাংলা। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে মায়ের ইন্তোকালের পর বাবার শিক্ষকতার চাকরির সুবাদে তাকে হুগলি, বাঁকুড়াসহ বিভিন্ন শহরের ইশকুলে পড়তে হইছে। হুগলিতে থাকনের সময় বিশাল গঙ্গা নদীর ঢেউ আর দিগন্তজোড়া প্রকৃতি তার অবচেতন মনে একজন শিল্পী হওয়ার বীজ রুপন হয়। পশ্চিম বাংলায় থাকলেও তিনি বারবার গেরামে ফিরতেন, কৃষকের পোলা-মাইয়াগো লগে খেলাধুলা করতেন, প্রকৃতির লগে সখ্য গড়তেন। এই গ্রামীণ জীবনের সরলতা আর প্রকৃতির বিশালতা তারে শিখাইছিল- ক্যানভাসে দিগন্ত কেমনে ধরা যায়।
মুস্তাফা মনোয়ারের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন আরম্ভ হয়ছিল কলকাতার শিশু বিদ্যাপীঠে। সেইখানে লেখাপড়ার পাশাপাশি সংগীত, ধ্যান আর শারীরিক-মানসিক দক্ষতার চর্চার ব্যবস্থা আছিল। দেশ স্বাধীনের পর তিনি ফরিদপুর হইয়া ঢাকায় আসেন এবং পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেইকা ১৯৫২ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। এই সময়েই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের আগুন বাংলায় জ্বইলা উঠছে। নবম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থাতেই মুস্তাফা মনোয়ার ভাষা আন্দোলনের সমর্থনে রাজনৈতিক ব্যঙ্গচিত্র আঁকেন এবং সেইগুলা লইয়া প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। শাসকগোষ্ঠী এই দুঃসাহস ভালো চোখে দেখে নাই। প্রশাসন তারে গ্রেপ্তার করে, তার এক মাস জেলও খাটতে হয়। সেই কারাবাস তার অন্তরে সাংস্কৃতিক বাতি জ্বালায়া এবং জাতীয়তাবাদ আর প্রতিবাদের চেতনাটারে পাকাপোক্ত কইরা দেয়।
ম্যাট্রিকের পরে তিনি কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু বিজ্ঞানের জটিল সূত্র, বিশেষ কইরা অঙ্কের লগে তার দোস্তি কোনোদিনই জমে নাই। একবার অঙ্কের মাস্টার নাটকীয় ভঙ্গিতে ঘোষণা দিলেন, মুস্তাফা মনোয়ার একশতে মাত্র চার পাইছে! ক্লাসের সবাই যখন হাসাহাসি করতাছে, সবাইরে অবাক কইরা দিয়া সে হাসি মুখে খাড়াইয়া আছে। কারণ জিগাইলে বললেন- "একটা অঙ্ক অন্তত ঠিক হইছে, এইডাই তো বড় কথা!" এই ঘটনা তার চরিত্রের এক আশ্চর্য দিক প্রকাশ করে- ব্যর্থতার মধ্যেও সৌন্দর্য খুঁজে নেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা। অঙ্কের এই দুর্বলতার কারণে যখন বিজ্ঞান পড়া প্রায় অসহনীয় হইয়া উঠছে, তখন প্রখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী তার আঁকা ছবিগুলা দেইখা বুঝলেন, এই পোলার আসল জায়গা ল্যাবরেটরিতে না, আর্ট স্টুডিওতে। মুজতবা আলীর উৎসাহ আর পরিবারের সহায়তায় মুস্তাফা মনোয়ার ভর্তি হন কলকাতা সরকারি চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে। ১৯৫৯ সালে সেইখান থেইকা ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান দখল কইরা প্রমাণ করেন, মুজতবা আলীর চোখ ভুল দেখে নাই।
চারুকলার ছাত্র হইলেও সংগীত আছিল তার আরেক ইশক। বাবার কাছে রাগ জৈনপুরি শেখার মধ্য দিয়া সংগীতে হাতেখড়ি। পরে ওস্তাদ সন্তোষ রায়ের (ওস্তাদ ফাইয়াজ খানের শিষ্য) কাছে শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নেন। আর্ট কলেজে পড়ার সময় বিখ্যাত 'হিজ মাস্টার্স ভয়েস' এইচএমভি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ কইরা বশীর আহমেদ আর সুবীর সেনের লগে যৌথভাবে সেরা গায়ক নির্বাচিত হন। পরে নির্মলেন্দু চৌধুরীর গণসংগীত দলের সাথেও যুক্ত ছিলেন। যদিও পরবর্তী জীবনে চিত্রকলার ব্যস্ততা বাড়ার কারণে নিয়মিত গান করা সম্ভব হয় নাই, তবু সংগীতের তাল-লয় তার পাপেটের ছন্দ নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা পালন করছিল।
মুস্তাফা মনোয়ারের চিত্রকলা, বিশেষ কইরা জলরঙের কাজ আছিল বিশ্বজুইড়া প্রশংসিত। বিশ্বখ্যাত শিল্পীরা তার তুলির মিতব্যয়ী ব্যবহার আর গভীর অভিব্যক্তির ভূয়সী প্রশংসা করছেন। অল্প কয়েকটা রেখা দিয়াই তিনি বিশাল অনুভূতি ফুটাইয়া তুলতে পারতেন। গ্রামীণ বাংলার নদী, মাঠ, আকাশ, কৃষকের জীবন আর নিসর্গ তার ছবির প্রধান বিষয় আছিল। জলরঙের পাশাপাশি তেলরং ও গ্রাফিক্সেও তিনি অসামান্য দক্ষতায় বাস্তববাদী দৃশ্যের লগে বিমূর্ত জ্যামিতিক বিন্যাসের যে নান্দনিক মেলবন্ধন ঘটাইছেন, তা তারে স্বতন্ত্র মর্যাদা দান করছে।
বাংলাদেশে পুতুলনাচের ঐতিহ্য বহু পুরানা। তবু এই শিল্পমাধ্যমটারে আধুনিক নাট্যভাষা আর মনস্তাত্ত্বিক শিক্ষার হাতিয়ার বানানোর কৃতিত্ব মূলত মুস্তাফা মনোয়ারের। কলকাতায় পড়ার সময় ভারতের রাজস্থানের পাপেট শো দেইখা তিনি মুগ্ধ হন। পরে ঢাকা আর্ট কলেজে মাস্টারি করার সময় পাপেট নিয়াই শুরু করেন গবেষণা আর এক্সপেরিমেন্ট। ষাটের দশকের শেষ দিকে তৎকালীন স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে পাপেটকে তিনি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। টেলিভিশনের পাপেট নাটকের আড়ালে শোষণ, বৈষম্য আর বেইনসাফী মনোভাবের বিরুদ্ধে সূক্ষ্ম অথচ তীব্র প্রতিবাদ জানাইতেন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হইলে মুস্তাফা মনোয়ার পাকিস্তান টেলিভিশনের চাকরি ছাইড়া কলকাতায় পাড়ি জমান। সেখানে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের সাংস্কৃতিক দলের নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি তিনি ব্যারাকপুরের শরণার্থী শিবিরে যুদ্ধবিধ্বস্ত শিশুদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য 'আগাছা', 'রাক্ষস' আর 'এ ব্রেভ ফার্মার'র মতো পাপেট নাটক মঞ্চস্থ করেন। এই নাটকগুলোতে তিনি পুতুলের রূপক লড়াইয়ের মাধ্যমে দেখাইতেন একজন সাধারণ কৃষক প্রতীকীভাবে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার রাক্ষসসুলভ শক্তিরে পরাজিত করতো। আমেরিকান তথ্যচিত্র নির্মাতা লিয়ার লেভিনের ক্যামেরায় ধারণ করা সেই দৃশ্য পরবর্তীতে 'মুক্তির গান' চলচ্চিত্রে যুক্ত হয়ে অমরত্ব লাভ করে।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি পাপেটকে জাতীয় শিক্ষার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হিশাবে গইড়া তোলেন। দীর্ঘ ১২ বছর বিটিভিতে চলা জনপ্রিয় শিশুতোষ অনুষ্ঠান 'মনের কথা' বাংলার লোকসংস্কৃতির অনন্য চরিত্র 'পারুল' (সাত ভাই চম্পার বোন) আর 'কৃষক বাউল'র মাধ্যমে বাংলার লোকজ রূপকথার চরিত্রগুলারে সামনে আনিয়া তিনি পোলাপানরে নৈতিকতা, সমাজ, প্রকৃতি আর পরিবেশ বিষয়ে নরম হাতে তালিম দিছেন। পরবর্তীতে তিনি ইউনিসেফ ও আরটিএ-র সহযোগিতায় শিশুদের মানসিক বিকাশে খেদমতে 'এডুকেশনাল পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টার' (EPDC) প্রতিষ্ঠা করেন। সিসিমপুরের মতো আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের শিশুতোষ প্রকল্পের সাথেও তিনি জড়িত আছিলেন, যেখানে মেরিওনেটের কারিশমা দিয়া শিশুদের বর্ণমালা ও সামাজিক আদব-কায়দা ও মূল্যবোধ শিক্ষার রাস্তা খুইলা দিছিলেন। আর বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) শুরুর জমানা থেইকাই মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন এর ভিজ্যুয়াল রূহের অন্যতম রূপকার। তিনি খালি অনুষ্ঠান বানাইছেন, এইডা কইলে কম কওয়া হইবো; বরং বলা যায়, তিনি বিটিভির রং, আলো আর ভাষার এক নতুন মিজাজ তৈরি করছেন।
মুস্তাফা মনোয়ারের শিল্পভাবনার আরেকটা খাস দিক আছিল, শিল্পরে গ্যালারির দেয়ালের ভিতর বন্দি না রাইখা জনতার কাছে পৌঁছাইয়া দেওয়া। সেইজন্য ঢাকার নগরজীবনে বেশ কিছু স্মরণীয় গণশিল্পকর্মের ছাপ রাইখা গেছেন। ১৯৭৪ সালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের মূল পিলারের পেছনে যে লাল উদীয়মান সূর্যের প্রতীক স্থাপন করা হয়, তার অন্যতম প্রধান নকশাকার ছিলেন তিনি। ভাষা শহীদদের রক্তিম ত্যাগ আর জাতির পুনর্জাগরণের ইশারা এই প্রতীক বহন করে, তার নান্দনিক রূপায়ণে তার অবদান অনস্বীকার্য। আবার ১৯৮৫ সালে ঢাকায় আয়োজিত দ্বিতীয় সাফ গেমসের জন্য হরিণ শাবকের আদলে তৈরি জনপ্রিয় মাসকট 'মিশুক'র নামকরণ ও নির্মাণে হামিদুজ্জামান খান এবং আবদুর রাজ্জাকের সাথে নেতৃত্ব দিছেন মুস্তফা মনোয়ার। পরে শাহবাগের শিশু পার্কের সামনে আর আর্মি স্টেডিয়ামের সামনে মিশুকের কংক্রিট আর ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়। ১৯৯৩ সালের ষষ্ঠ সাফ গেমসের জন্য যে বিশাল জীবন্ত বাঘ-পাপেট ‘অদম্য’তৈরি হইছিল, সেইটার একক পরিকল্পনাকারী ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার।
মুস্তাফা মনোয়ার কেবল একজন নিভৃতচারী শিল্পী ছিলেন না, বরং তিনি জাতীয় নীতিনির্ধারণী বিভিন্ন পদে থাইকা বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিছেন। চারুকলা ইনস্টিটিউটের প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু কইরা তিনি একে একে বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপমহাপরিচালক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক এবং এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হইয়া দেশের সাংস্কৃতিক অবকাঠামো নির্মাণে বড় ভূমিকা রাখছেন। খালি অফিস-আদালতের দাপ্তরিক কাজই না- সার্ক সন্ধ্যা, সাফ গেমসের উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠানসহ বহু আন্তর্জাতিক মানের মেগা-ইভেন্টের ভিজ্যুয়ালাইজার আর ডিরেক্টর হিসেবেও তিনি নিজের মুনশিয়ানা দেখাইছেন। মস্কো চলচ্চিত্র উৎসব, হংকং এশিয়ান কালচারাল ফেস্টিভ্যাল, সিউল এশিয়ান গেমসসহ নানা আন্তর্জাতিক মজলিসে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয় তিনি গর্বের সহিত তুলে ধরছেন।
ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৬৫ সালে তিনি চট্টগ্রামের মেরী মনোয়ারের নিকাহ করেন। মেরী মনোয়ার নিজেও ছিলেন বিদুষী শিক্ষাবিদ; ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে শিক্ষকতার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ঢাকা মিউজিক কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের সংসারে এক ছেলে- সাদাত মনোয়ার বাংলাদেশ বিমানের পাইলট। এক কন্যা- নন্দিনী মনোয়ার কর্মরত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে।
মুস্তাফা মনোয়ার জীবনের শেষ পর্বে ফুসফুসের ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ, নিউমোনিয়া আর প্রোস্টেট ক্যানসারের লগে দীর্ঘদিন মুকাবিলা করছিলেন। অবশেষে ২০২৬ সালের ২৯ জুন সকালে ঢাকায় নব্বই বছর বয়সে এই শিল্প-সাধকের দুনিয়াবি সফরের ইখতিতাম ঘটে। তার বিদায় যেন বাংলাদেশের শিল্প, সম্প্রচার আর লোকজ সংস্কৃতির এক স্বর্ণযুগের পর্দা নামাইয়া দিল। তবে কিছু মানুষ দুনিয়া থেইকা বিদায় নিলেও আসলে কখনো হারায়া যান না। মুস্তাফা মনোয়ারও তেমনই এক মানুষ। পারুল, বাউল, পাপেট, রংতুলি, টেলিভিশনের পর্দা আর অসংখ্য শিল্পকর্মের ভেতর দিয়া তিনি বাংলাদেশের শিশুদের মনে যে খোয়াবের বীজ বুনে গেছেন, সেই বীজ বহুদিন ধরিয়া অঙ্কুরিত হইতে থাকবো। তিনি বিশ্বাস করতেন- ‘স্বপ্নই একটা দেশরে জিন্দা রাখে।’ আর সেই স্বপ্নেরই কারিগর ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার; বাংলার লোকজ ঐতিহ্যরে আধুনিক মাধ্যমের গাড়িতে চড়াইয়া তিনি যে নান্দনিক সফর শুরু করছেন, সেই সফরের রেশ বাংলাদেশের সংস্কৃতির শরীরে বহুকাল জারি থাকবো।
কোন মন্তব্য নেই