Header Ads

Header ADS

ত্যাগের খুশবু ।। আফসার নিজাম

 

ত্যাগের খুশবু
আফসার নিজাম

বর্ষার মেঘলা আকাশ ছাপিয়ে যখন ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত জিলহজ মাসের চাঁদ আকাশে উঁকি দেয়, তখন চারদিকের আনন্দঘন পরিবেশের মাঝেও নাজিবের বুকের ভেতর এক অজানা হুতম পেঁচা ডেকে উঠে। মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়েন তাকে আজ ক্লান্ত করে দিয়েছে। ফ্যাসিস্ট সিসটেমে কারণে তার ব্যাবসা ক্যাপাবেলিটি তলানিতে ঠেকেছে। ভেবেছিলো জুলাই অভ্যুাত্থানের কারণে সময় পরিবর্তন হয়েছে এবার বুঝি ফিরবে ভাগ্যের চাকা। কিন্তু না বৃথাই গেলো এই তারুণ্যে জীবন। বৃথাই এই বিপ্লব। যেভাবে আশা করেছিলো তার সিকি আনাও পরিবর্তন হয়নি। তার ব্যাবসার অবস্থা সেই রকমই, খাদের কিনারে এসে হাজির হয়েছে। যার প্রেক্ষিতে এবারের কুরবানী দেয়া তার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। অথচ প্রতি বছর এই সময়ে তাদের আঙিনায় আল্লার নামে কুরবানীর জন্য হাজির থাকতো কুরবানীর গরু। মহল্লার মানুষদের সাথে বাতচিৎ করতো কুরবানীর হাট নিয়ে, গরুর দাম নিয়ে। পোলা মাইয়াদের কোলাহল আর ঈদের চিরচেনা ব্যস্ততায় মুখর থাকত পুরো বাড়ি। এবারই চিরচেনা সেই উঠোনটা একদম খাঁ খাঁ করছে। নিজের অক্ষমতা নিজের ভেতরে কুড়েকুড়ে খাচ্ছে। 
-সারা বছরেও আল্লাহর জন্য একটি নাজরানা দিতে পারতেছি না। এই অক্ষমতা জন্য কাকে দোষ দেবো।
একটা অক্ষমতার অপরাধবোধ তাকে মলিন করে দেয়। পোলা মাইয়ার জানের বদলে জান দেয়া এবার হবে না। এই কথা মনে হতেই পরিবারের মুখের দিকেই তাকাতে তার লজ্জা হয়।
ঈদের আগের দিন সকাল। বাড়ি থেকে বের হয় নাজিব। পুরনো কিছু পাওনাদারদের তাগাদা দেয়। না তারা কেউ টাকা দিতে পারবে না। কয়েকজন বন্ধুর কাছেও টাকা ধার চায়। সবারই ঈদে কুরবানীর খরচ। হাতে অতিরিক্ত টাকা না থাকায় কেউ টাকা ধার দিতে পারছে না। অগতা ফিরে আসে। সবাই হাটে গরু কেনায় ব্যস্ত। নাজিব একপা একপা করে বাজারে দিকে রওয়ানা দেয়। বাজারে গরুর গোস্তের দাম আজ বেশ চড়া। সে পাঁচ কেজি গরুর গোস্ত কিনে বাড়ি ফিরে। কারণ কুরবানীর গোস্তর জন্য হাত পাততে পারবে না। আর এই মহল্লায় সে একেবারেই নতুন ভাড়াটিয়া। কারো সাথে পরিচয় নেই। আসে পাশে কোনো আত্মীয় স্বজনও নেই। তার পোলাপাই যেনো ঈদের দিন কিছুটা হলেও কুরবানীর গোস্তের স্বাদ পায়। সেই জন্যই এই গোস্ত কেনা। বাড়িতে ঢুকতেই তার মেয়ে বাজারের ব্যাগ হাতে নেয়। 
-মা মা বাবা ঈদের বাজার আনছে। 
নাজিবের স্ত্রী ইভানা কষ্ট চেপে, মুখে মৃদু হাসির আবরণ দিয়ে বাজরের ব্যাগটি রান্নাঘরে নিয়ে যায়। বাচ্চাদের ডাকে 
-দেখো দেখো তোমার বাবা গোস্তা আনছে। এখনই রান্না করবো। কাল আমরা সবাই মিলে গোস্ত খাবো। অনেক গোস্ত আনছে।
ইভানা অত্যন্ত বুদ্ধিমতী এবং সহনশীল নারী; সে ভালো করেই জানে, তার স্বামীর ব্যবসার অবস্থা কতোটা নাজুক। দুপুরের পর থেকেই ঘরময় মশলার ঘ্রাণ। মশলার ঘ্রাণ ঘরকে উৎসবমুখর করে তোলে। মাগরিবের নামাজের পরপরই ইভানা সেই গোস্তটুকু রান্না করে ফেলে, যাতে ঈদের সকালেই ঘরটি আনন্দময় হয়ে ওঠে।
রাত তখন প্রায় এগারোটা কি সাড়ে এগারোটা। সবাই গ্রামে চলে গেছে বলে মহল্লা কিছুটা নিঝুম। কেবল মাঝে মাঝে দূর থেকে কুরবানীর গরু ছাগলে ডাক ভেসে আসে। আজ যেনো ঘুম আসছে না। বেদনার আকাশটা মেঘেলা হয়ে আছে। এমন সময় নাজিবের মোবাইলটি বেজে উঠে। ফোনের ওপাশে তার জিকিরে দোস্ত সায়মন। অত্যন্ত পেরেশানি গলায় সায়মন কয়, 
-দোস্ত এবার ঈদে আমাদের অফিসে কারোই বেতন বোনাস হয় নাই। তাই ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাই নাই। তুইতো জানস, আমরা কয়েকজন কলিগ মিলে এক মেসে থাকি। তারাও বাড়ি যায় নাই। কিন্তু এখানে একটা সমস্যা হইছে। 
-কি সমস্যা দোস্ত ক। 
-না মানে আমাগো রান্নার বুয়া সকারেই গ্রামের বাড়ি চইলা গেছে। 
-তাতে সমস্যা কি। 
-না মানে সে রান্না না কইরাই চইলা গেছে। দুপুরে কোনো রকম খাইছি। এখন রাইত, আর এলাকার সব হোটেল বন্ধ। এখন আমরা কয়েকজন না খাইয়া রইছি। 
নাজিবের মনের ভেতরটা দুমরে মুছরে গেলো। ষোল বছরের শোষণ আজ আমার দেশের কি অবস্থা। শেষ করে দিয়ে পালিয়ে গেছে ফ্যাসিস্ট ডায়েনী। মানুষের জীবন আজ খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে। নাজিব বিষয়টা ইভানার সাথে শেয়ার করে। ইভানা এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকিয়ে থাকে নাজিবের দিকে। নাজিব নিশ্চুপ। তারপর এক নিশ্বাসে বলে,
-তুমি তাদের এখনই আসতে বলো। ঈদের গোস্ত রান্না করা আছে। আমি চটকরে চুলায় একটু ডাল চড়িয়ে দেই। তারা আসতে আসতে হয়ে যাবে। আল্লাহ তুমি সবাইকে শান্তি দাও।
বলেই সে রান্না ঘরের দিকে চলে যায়। নাজিব সায়মনকে ফোন করে। 
-দোস্ত তোরা এখনই চলে যায়। রান্না করা আছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই চার কলিগ নিয়ে সায়মন বাড়িতে হাজির।
ক্ষুধার্ত সায়মন ও তার কলিগদের সামনে ইভানা গরম গোস্তের বাটি আর ভাত পরিবেশন করে, তাদের চোখে-মুখে তখন ক্ষুধার হাঙর। খাবার দেখে আনন্দের আভাস ফুটে উঠে, তাদের এই উজ্জসিত মুখ দেখে নাজিব ও ইভানার মন ভরে ওঠে। নিজেদের দুঃখগুলো যেনো জানালা দিয়ে পালিয়ে যায়। সাময়নরা পরম তৃপ্তিতে খাবার খেলো। যেনো বহুদিন খায়নি। কোনো অচেনা দ্বীপে আটকে ছিলো। যেখানে কোনো খাবার ছিলো না। এবার তারা ইভানার তারিফ করে বললো
-ভাবি এমন চমৎকার গরুর গোস্ত রান্না অনেক দিন খাই নাই। মেসে খেতে খেতে পেটটাই নষ্ট করাই ফালাইছি।
-না না ভাই আমি তো এমনি রান্না করি।
প্রশংসা শোনে ইভানার সত্যিই ভালো লাগছে। খেয়ে তারা সবাই বিদায় নেয়। 
এখন গভীর রাত। মহল্লার সবাই যখন শান্তির ঘুমে আচ্ছন্ন তখন নাজিব আর ইভানা ড্রয়িংরুমের আবছা আলোয় বসে একে অপরের দিকে চেয়ে মৃদু হাসে। অতীতের গল্প করে। গত ঈদগুলোর স্মৃতি হাতরায়। সুখকর সেই স্মৃতি তাদের কিছুটা হলেও আনন্দিত করে। তারা জানতো, পরদিন তাদের পোলা মাইয়ার জন্য ঘরে আর কোনো গোস্ত রান্না নাই। 
ঈদের সকাল। এই ঈদের সকালটা অন্য যেকোনো বছরের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা- নিস্তেজ মেঘাচ্ছন্ন। সকালের সূর্যের আলো যখন জানলা গলে ড্রয়িংরুমে এসে খেলা করে, তখন নাজিবের দুই পোলা-মাইয়া আরিফ ও সায়মা নতুন জামা পরে হাজির। তাদের চোখে-মুখে সেই চিরচেনা ঈদের চঞ্চলতা নাই। বাপ পোলা মিলে ঈদের নামাজ শেষ করেই ঘরের ভেতর চলে যায়। আর বাহির হয় না। চারপাশের বাড়িগুলোয় কুরবানী করার আওয়াজ। “কুল ইন্না সালাতি ওয়া নুসুকি ওয়া মাহইয়ায়া ওয়া মামাতি লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন।” তারপর গোস্ত কাটার শব্দ। প্রতিবেশীদের বাড়ি থেকে গোস্ত রান্না সুবাস ভাইসা আসে, তখন নাজিবদের বাড়িটি নিস্তব্ধ।
এবার ঈদটি ছিলো জুম্মাবার। জুম্মার নামাজ পড়েই সাবই এলো খাবার টেবিলে। গরম ধোঁয়াওঠা ভাত, কাচকি মাছের চড়চড়ি, পাতলা ডাল, আলুর ভর্তা। কোনো ঈদে এমন খাবার আগে কখনো হয়নি। আরিফ ও সায়মা বারান্দায় দাঁড়িয়ে, পাশের বাড়িতে ছেলেমেয়েরা মজা করছে। ইভানা রান্নাঘরের কোণে চোখ মুছে, নাজিব মাথা নিচু করে বসে থাকে। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়। নিশ্চয় সে কোনো অপরাধ করেছে তার জন্য আজ এ অবস্থা। আজকে ঈদের দিনটা বেশ লম্বা, শেষ হইতে চায় না। সে মনে মনে চাইলো ঈদের দিনটা খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায়। দিনটা শেষ হলেই সে বেদনা থেকে বেঁচে যায়। ঈদটা কেটে গেলো নিঃশব্দে, উৎসব ছিলো না, আনন্দ ছিলো না। আসর শেষে সূর্য ধীরে ধীরে ডুবে যায়। মাগরীবের আজান ভেসে আসে আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর।
মাগরিব শেষে সবাই ড্রইং রুমে আসে। সন্ধ্যা হওয়াতে সবাই যেনো ঈদের পেরেষানি থেকে বেঁচে যায়। এখন সবাই কিছুটা সাভাবিক হয়ে ওঠছে। সবাই সবার দিকে তাকাতে পারছে। মেঘের আড়াল থেকে যেনো এক টুকরো চিকন চাঁদ দেখা দিচ্ছে। রাতের খাবার নিয়ে এখন তাদের চিন্তা নেই। ঠিক এই সময়ই কলিংবেলের শব্দে থমকে গেলো সবকিছু। এখন আবার কে এলো। মেহমান আসলে কি হবে এই চিন্তায় নাজিব তাকায় ইভানার দিকে ইভানা তাকায় নাজিবের দিকে। ঘোর কাটতেই নাজিব এগিয়ে যায় দরজার দিকে। দরজা খুলতেই চোখ স্থির হয়ে যায়। বাইরে দাঁড়িয়ে মোমেন। দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ে সবচেয়ে কাজের বন্ধু। বলায় যায় জানের জান পরানের পরান। বিশ্ববিদ্যালয় শেষ হওয়ার পর সে ইউরোপ চলে যায়। সেই থেকে আর যোগাযোগ নাই। কম করে হলেও বিশ বছর হবে যোগোযোগহীন। বয়স বাড়লেও মোমেনের কোনো পরিবর্তন নাই। সেই আগের মতোই। তার পরনে ঈদের পাঞ্জাবি, হাতে এক বিশাল প্লাস্টিকের বস্তা। মোমেন নাজিবকে এক প্রকার ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকে মেঝেতে বস্তাটা রাখে। তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে বলে।
-দোস্ত, কেমন আছিস। সাময়ন থেকে তোর নাম্বার ও ঠিকানা জোগার করলাম। আমি ঢাকায় আজ ছয় মাস। কারো সাথেই তেমন যোগাযোগ করতে পারি না। দেশেই বিজনেস করমু। আমার একটা ব্যবসা আছে লন্ডনে। সেটারই একটা অফিস ঢাকায় করছি। তোকে আমার দরকার।
-ঠিক আছে। তুই সায়মনরে কই পাইলি।
-জলির কাছে থেকে সায়মনের নাম্বার নিলাম, সায়মন থেকে তুই। আর সায়মনের কাছে তোর সব খবর পাইলাম।
-ঠিক আছে ঠিক আছে চল আমরা খাওয়া দাওয়া করে নেই। তারপর সব হবে।
-আরে কি কস তুই। আমি ফুল পেট গরু দিয়া বোঝাই করছি। কিছুই খামু না। ভাবি এক গ্লাস পানি দেন। পানি খাই।
-আচ্ছা ভাই দিচ্ছি।
-শোন দোস্ত একদম কিছু মনে করিস না! আমার গরুটা জবাই করতে দেরি হইয়া গিয়েছিলো। কসাই পাইছি দুপুরের পরে। কাজ শেষ করেই আমি খেয়ে এই ছোট্ট তোহফাটা তোর আর ভাবীর জন্য নিয়া আইলাম।
-তুই এইটা কি করলি। সেই জন্য এতোগুলো... 
-না দোস্ত তোর সম্পর্কে আমি সব শুনছি। কিছু চিন্তা করিস না। আবার সব হইবো। আমার সাথে তুই ব্যাবসা করবি। আমরা আবার ইউনিভার্সিটির লাইফের মতো একসাথে সব করবো।
-আ... আ...
আ... আ... করিস না বলেই মোমেন নাজিবকে আর কিছু বলতে দেয় না। তার কাঁধের উপর একটা চাপড় মেরে দ্রুত বিদায় নেয়। নাজিব স্তব্ধ হয়ে সেই বিশাল গোস্তের বস্তাটির দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। তখনই সে জায়নামাজে গিয়ে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং পরম করুণাময়ের দরবারে হাত তোলে। পেছনে পেছনে ইভানা ও তাদের পোলা মাইয়া হাত তোলে। নাজিব ডুকরে কেঁদে উঠে, 
-হে আল্লাহ! তুমি সত্যিই পরম করুণাময়, পরম দয়ালু। তুমি তোমার পবিত্র কুরআনে বলছো, ‘গোপনে বা প্রকাশ্যে দান করলে আল্লাহ তা‘আলা বান্দার পাপ মোচন করেন । খাঁটি অন্তরে দানকারীদের জন্য রয়েছে প্রভুর কাছে ক্ষমা, সম্মানজনক রিজিক এবং সুউচ্চ মর্যাদা।’ আজ আমার পরিবার নিঃস্বার্থ ত্যাগের যে পরীক্ষা দিছিলো, তুমি তার চেয়েও বেশি প্রতিদান দিছো। তোমার শুকরিয়া আদায় করে শেষ করা যাবে না। আল্লাহ তুমি আমারে ক্ষমা করো। আমার নেয়ামত বাড়িয়ে দাও। তোমার যতোটুকু ইচ্ছা ততোটুকু দাও। আমার কোনো ক্ষেদ নাই। আমীন।
-আমীন। সবাই একসাথে বলে।
নাজিবের পরিবার আজ অনুভব করে ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসি জীবন। ত্যাগ কখনো খালি হাতে ফেরায় না। আল্লাহর নেয়ামতের খাজাঞ্চিখানা অসীম, আজ সেই পরম সত্যের নাজরানা পেলো নাজিব ও তার পরিবার। মোনাজাত শেষ হতেই তাদের বাড়ির বিষাদময় পরিবেশটা জান্নাতের বাগান হয়ে যায়। আরিফ আর সায়মা আনন্দে নাচতে থাকে। ইভানা দ্রুত সেই গোস্ত ধুয়ে চুলায় চড়ায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই রান্নাঘর থেকে ভেসে আসে সেই চিরচেনা কুরবানীর গোস্ত রান্নার ঘ্রাণ।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.