ইসলামী সাংস্কৃতিক চিন্তার পুনর্গঠন ।। আফসার নিজাম
ইসলামী সাংস্কৃতিক চিন্তার পুনর্গঠন
আফসার নিজাম
মুসলমানের ইতিহাসে এমন অনেক সময় আইছে, যখন সে নিজের দিকে ফিরা চাইছে। নিজের শিকড়, নিজের চিন্তার দিগন্ত, নিজের সভ্যতার আয়না—সবকিছুর সামনে দাঁড়াইয়া নিজেরে নতুন কইরা চিনতে চাইছে। ইসলামী সাংস্কৃতিক চিন্তার পুনর্গঠনও ঠিক তেমন এক সন্ধিক্ষণের নাম। এইডা খালি কোনো স্লোগান না, কোনো আবেগের ঢেউ না; বরং এক গভীর আত্মজিজ্ঞাসা—আমরা কই থেইকা আইলাম, কই দাঁড়াইয়া আছি আর আগামীর রাস্তাডা কোন দিকে যাইবো?
সপ্তম শতাব্দীতে আরবের মরুভূমির বুক থেইকা যে নূরের কাফেলা যাত্রা শুরু করছিল, রসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমে যে ওহীর আলো মানবসমাজে ছড়াইয়া পড়ছিল, সেই আলো অল্প সময়ের মধ্যেই শুধু একটা ধর্মীয় বিশ্বাসের গণ্ডিতে আটকা থাকে নাই। ওই আলো মানুষ, সমাজ, রাষ্ট্র, জ্ঞান, সংস্কৃতি আর সভ্যতার এক নতুন দিগন্ত খুলে দিছিল।
ইসলামের প্রথম যুগের মুসলমানরা বুঝছিল—ওহী আর বুদ্ধি একে অপরের দুশমন না। বিশ্বাস আর চিন্তার মইধ্যে কোনো দেয়াল তোলার দরকার নাই। কুরআনের জ্ঞানচর্চার আহ্বান মুসলিম মননরে ঠেল দিছিলো অনুসন্ধান, পর্যবেক্ষণ আর সৃষ্টিশীলতার দিকে। আর এই কারণেই বাগদাদ, কর্ডোভা, দামেস্ক, কায়রো—এইসব শহর শুধু রাজদরবারের ঠিকানা ছিল না; এগুলা আছিল জ্ঞান আর সভ্যতার বাতিঘর।
আল-কিন্দী, আল-ফারাবী, ইবনে সিনা, ইবনে রুশদ, ইবনে খালদুন, জালাল উদ্দিন রুমি, ইবনুল আরাবী—এইসব মনীষীরা মুসলিম চিন্তার আকাশে এমন এমন প্রদীপ জ্বালাইয়া গেছেন, যার আলো দুনিয়ার জ্ঞানভাণ্ডাররে সমৃদ্ধ করছে। বাংলার মাটিতেও শাহ মুহম্মদ সগীর, আলাওলের মতো কবি-সাহিত্যিকরা সেই বৃহৎ ইসলামী সভ্যতার সাংস্কৃতিক সুরের লগে বাংলার ভাষা আর মাটির গন্ধ মিশাইয়া এক নতুন রূপ দিছিলেন।
কিন্তু ইতিহাস তো এক সরল নদী না মিঞা। নদীর মতোই এরও ভাঙন আছে, বাঁক আছে। রাজনৈতিক দুর্বলতা, পরাজয় আর দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কারণে মুসলিম সমাজের ভিতরে ধীরে ধীরে চিন্তার জড়তা বাড়তে থাকে। সৃজনশীল অনুসন্ধানের জায়গায় অনেক সময় পূর্বসূরিদের অন্ধ অনুসরণ, প্রশ্নহীন অনুকরণ আর তাকলিদের প্রবণতা জায়গা করে নেয়।
যেই জাতি একদিন জ্ঞানের ময়দানে অগ্রণী ছিল, তারাই একসময় নিজের চিন্তার দরজা বন্ধ কইরা ফেলে। ইজতিহাদের প্রাণবন্ত ধারাডা দুর্বল হইয়া পড়ে। আর এইখান থেইকাই শুরু হয় এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক স্থবিরতা।
এই বাস্তবতার ভিতর থেইকাই ইসলামী চিন্তার পুনর্গঠনের কথা সামনে আসে। অর্থাৎ পুরান ঐতিহ্য ফালাইয়া দেওয়া না, আবার চোখ বন্ধ কইরা অতীতের ঘরে বসে থাকাও না। বরং নিজের মূল বিশ্বাস আর সভ্যতার শিকড় ঠিক রাখিয়া নতুন যুগের প্রশ্নের মোকাবিলা করা।
এই চিন্তার অন্যতম বড় নাম আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল। তার The Reconstruction of Religious Thought in Islam মুসলিম চিন্তার জগতে এক নতুন দরজা খুলে দেয়। ইকবাল মনে করতেন, ইসলাম কোনো স্থবির কাঠামোর নাম না; ইসলাম হইলো চলমান জীবনবোধ, সৃষ্টিশীলতা আর ক্রমবিকাশের নাম।
তার কাছে প্রকৃত তাকওয়া মানে শুধু আনুষ্ঠানিকতা না; বরং জীবনরে আল্লাহর দেওয়া দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করা। মানুষ নিষ্ক্রিয় কোনো মাখলুক না, বরং আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে এমন এক মর্যাদাপূর্ণ সৃষ্টি, যার হাতে চিন্তা আছে, ইচ্ছাশক্তি আছে, কর্মের ক্ষমতা আছে।
ইকবালের “খুদি” তত্ত্ব এই জায়গাতেই বড় গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মানুষরে আত্মমর্যাদা আর আত্মবিশ্বাসের শিক্ষা দিছেন। তার মতে, যে মানুষ নিজের ভিতরের শক্তিরে চিনতে পারে, সে ইতিহাসের গতিপথেও প্রভাব ফেলতে পারে।
ইকবাল ইজতিহাদরে ইসলামের জীবন্ত শক্তি হিসেবে দেখছিলেন। সময় বদলাইবো, সমাজ বদলাইবো, মানুষের প্রশ্ন বদলাইবো—তাই নতুন বাস্তবতার সামনে দাঁড়াইয়া নতুন চিন্তার দরকার হইবো। তবে সেই নতুন চিন্তা হইতে হবে শিকড়হীন না; বরং কুরআন, সুন্নাহ আর ইসলামী নৈতিকতার ভিতের উপর দাঁড়ানো।
কোন মন্তব্য নেই