Header Ads

Header ADS

আল মুজাহিদীর কলমে সমাজ ও সময়ের প্রতিচ্ছবি ।। আফসার নিজাম

 


আল মুজাহিদীর কলমে সমাজ ও সময়ের প্রতিচ্ছবি
আফসার নিজাম

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ঊনিশ শতকের ষাটের দশকে সৃজনশীলতার জোয়ার আসে। খ্রিস্টিয় ব্রিটিশ শাসন থেইকা স্বাধীন হওয়ার সুফল। পরাধীনতার দুইশ বছরের ফেতনা থেইকা মুক্ত হয়ে স্বাধীনতার মাত্র এক যুগের মধ্যেই এই পরিবর্তন। এই সময়টি কেবল সাহিত্যের জবান বা অলংকারের পরিবর্তনের জন্য নয়, বরং সাহিত্যিক মানসে এক আমূল রূপান্তর ঘটাইয়া ফেলায়। তারা রোমান্টিকতা জমানা উতরাইয়া বিশ্বজনীন আধুনিকতার সাথে দেশীয় শেকড়ের এক অপূর্ব মালা গাইথা ফেলায়। এই সৃজনশীল ধারার একজন কবি আল মুজাহিদী। তার কলম কেবল ব্যক্তিগত প্যানপ্যানানির অনুরণন নয়, বরং তা সমকালীন সমাজ, রাজনীতি এবং ইতিহাসের এক জেন্ত দলিল হইয়া হাজির থাকে। আল মুজাহিদীর সাহিত্যিক কিয়াত এমন এক প্রেক্ষাপটে বিকশিত হইছিলো যেইখানে ব্যক্তিগত ও তামুদ্দুনিক মুক্তির আকুতি সমান্তরালভাবে প্রবাহিত হইছিলো। মুজাহিদীর কবিতায় সমাজ ও সময়ের যে প্রতিচ্ছবি ধরা পড়ছে, তা নিছক বর্ণনামূলক নয়, বরং গভীর দার্শনিক ও সমাজতাত্ত্বিক বয়ানে জারিত। ১৯৪৩ সালের ১ জানুয়ারি টাঙ্গাইলের এক সমভ্রান্ত পরিবারে তার জন্ম। বাপ আবদুল হালিম জামালী আর মা সাখিনা খান তার নৈতিক ও শৈল্পিক মানস গঠনে প্রাথমিক তরিকা বাতলাই দেয়ার ভূমিকা রাখছিলো। ষাটের দশকের উত্তাল রাজনৈতিক ডামাঢোল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান ও বাংলা সাহিত্যের অধ্যয়ন তাকে সমাজের কাঠামো ও মানুষের ইনসানিয়াহ বুঝতে গভীর নজর দান করছিলো। এই সমাজতাত্ত্বিক অধ্যয়ন তার লেখনীকে এক ভিন্নধর্মী গাম্ভীর্য ও বিশ্লেষণাত্মক চেহরা দান করেছে, যা তাকে কেবল একজন আবেগপ্রবণ কবি থেকে ‘কাল ও সমাজ সচেতন বিশ্ববীক্ষণের কবি’ হিসেবে হাজির করছে।
আল মুজাহিদীর সাহিত্যিক জীবনের উন্মেষ ঘটে এমন এক সময়ে যখন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান এক গভীর রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলো। ছাত্র রাজনীতিতে তার কায়ীক অংশগ্রহণ এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন তাকে এই তমুদ্দুনের সময়কে বুঝতে সাহায্য করছিলো। তার কবিতায় এই রাজনৈতিক হারা-রাহ বারবার ফিরা আইছে দ্রোহ ও প্রতিরোধের ভাষার মধ্য দিয়া। ১৯৬৮ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী থাকাকালীন তিনি যে ‘কারাবন্দী’ কবিতাটি তাহরীর করেছিলেন, তা কেবল কবির ব্যক্তিগত কারাবাসের চিত্র নয়, বরং একটি পরাধীন জাতির সম্মিলিত হাহাকার ও মুক্তির স্বপ্নের শৈল্পিক তাবীর পরিলক্ষিত হইছে। এই কবিতায় তিনি কারাগারকে নিছক পাথুরে দেয়াল হিশেবে না দেইখা রূহানীয়াতের মুক্তির এক নতুন ক্ষেত্র হিসেবে হাজির করেছেন, যেখানে দ্রোহের আগুন আরও তীব্র হয়ে ওঠছে। এর মধ্যে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ আল মুজাহিদীর সাহিত্য ও জীবনে এক আমূল পরিবর্তন আনে। তিনি রাষ্ট্রিক জঙ্গে কেবল একজন দর্শক ছিলেন না, বরং একজন সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের তাত্ত্বিক শায়েখ হিসেবে কাজ করেছেন। তার কবিতায় যুদ্ধের তারাস, আগুনের দহন এবং অদম্য সাহসের যে চিত্রকল্প আমরা দেইখা থাকি, তা তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সামান। আগুনের এই রূপকল্প তার কবিতায় কেবল ইতলাফের প্রতীক নয়, বরং তা জাতির মুক্তি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ইনসাফ কায়েমের প্রতীক হিশেবে জাহের হইতে দেখি।
তার পয়লা সময়ের কবিতায় এক প্রবল দুনিয়াদারী এবং দার্শনিক মহাওয়াস লক্ষ্য করা যায়। প্রথম কবিতার কিতাবে ‘হেমলকের পেয়ালা’-র নামকরণেই প্রাচীন গ্রিক জীবন-দর্শনের প্রতি তার আকর্ষণের প্রমাণ মেলে। সক্রেটিসের জীবনদান এবং গ্রিক ট্র্যাজেডির সেই মুহজিন অথচ মহিমান্বিত রূপ তাকে গভীরভাবে আলোড়িত কইরাছিলো। এই পর্বে তার কবিতা সমাজবাস্তবতা থেকে কিছুটা দূরে মহাজাগতিক বিস্ময়ে মাবাহুস থাকলেও, তা মূলত মানুষের অস্তিত্বের সংকটকেই তুইলা ধরছে। আধুনিক সভ্যতার আণবিক অনিশ্চয়তা এবং মানুষের গোলামিয়াত তাকে বিচলিত করেছে। ‘হেমলকের পেয়ালা’ থেকে ‘মৃত্তিকা অতি-মৃত্তিকা’ পর্যন্ত তার কবিতার বিবর্তন মূলত আসমান থেইকা জমিনের দিকে ফিরত আসার এক নিরন্তর সফর দেখতে পাই। আল মুজাহিদীর কবিতাজগতে ‘মৃত্তিকা’ বা মাটি কেবল একটি উপাদান নয়, বরং তা এক গভীর রূহানী ও রাজনৈতিক এহসাসের নাম। তিনি নফসকে মাটির আওলাদ হিশেবে কল্পনা করেন এবং মাটির প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতাকে কবিতার প্রধান এহসাস করে তোলেন। নক্ষত্রের স্তূপ থেইকা বারবার এই আদিম মৃত্তিকার কাছেই ফিরে আসার আকুতি তার কবিতাকে জাতীয়তাবাদী জেহেনের এক সার্থক রূপকার হিশেবে জাহির করেছে। তার কাছে দেশ এবং মাটি কেবল মানচিত্রের অংশ নয়, বরং তা অস্তিত্বের সমস্ত ভূগোলে গেঁথে থাকা এক অনিবার্য শক্তি হইয়া ধরা দিছে।
আল মুজাহিদীর সাহিত্যিক সত্তার সমান্তরালে তার সাংবাদিক সত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করছে। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে ইমামতি করছেন। এই সাহিত্যিক-সাংবাদিকতা তাকে কেবল রিজিক দান করেনি, বরং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বলয়ের অত্যন্ত কাছাকাছি থাকার সুযোগ কইরা দিছে। ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদকের ইমামতি এই পত্রিকাকে তৎকালীন বাংলাদেশের সাহিত্য আন্দোলনের এক মঞ্জিলে পরিণত করছিলো। তিনি কেবল নিজের সাহিত্য সৃষ্টি করেননি, বরং তরুণ প্রজন্মের কলমমাঝিদের জন্য একটি পাটাতন তৈয়ার করছেন। ফলে তার সাংবাদিক সত্তা তাকে সমাজ বিকাশের সামনের কাতারের সিপাহী হিশেবে হাজির করছে এবং তার গদ্যে এনে দিয়েছে এক তীক্ষ্ণ ও প্রত্যক্ষ সমাজ সচেতনতা। আল মুজাহিদী মূলত কবি হিসেবে পরিচিত হইলেও তার গদ্য সাহিত্য- উপন্যাস এবং ছোটগল্প গভীর পর্যবেক্ষণ কুদরাহ এবং জীবনবোধের পরিচয় বহন করছে। তার গল্পগ্রন্থ ‘বাতাবরণ’ ও ‘প্রপঞ্চের পাখি’তে তিনি গ্রামীণ জীবনের সারল্য, শহুরে জীবনের তাকীদ এবং মানুষের অবদমিত ইলমুন নাফসের এক নিপুণ চিত্র তুলে ধরছেন। এসব গল্পে ছিলো দার্শনিক সওয়াল ও সামাজিক ইনতিকাদের এক সূক্ষ্ম বুনন। তার উপন্যাস ‘চাঁদ ও চিরকুট’, ‘প্রথম প্রেম’ এবং ‘লাল বাতির হরিণ’এ তিনি কাহিনীর আবরণে মানব মনের গভীরে ঢুইকা পড়ছেন। এই কারণে সম্পর্কের জটিলতা এবং জীবনের রহস্য উন্মোচনে তার গদ্যে এক ধরণের কাব্যিক লাতাফাত লক্ষ্য করা যায়।
সমাজের নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে কবির উদ্বেগ তার বিভিন্ন প্রবন্ধ ও কলামে অত্যন্ত খোলাশা। তার মতে, একটি আদর্শ সমাজ কেবল বস্তুগত উন্নতিতে নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধের বিকাশে সার্থক হইয়া ধরা দেয়। সামাজিক অস্থিরতা এবং অপরাধ প্রবণতার বিরুদ্ধে তার কলম সর্বদা শাণিত তলোয়ারের মতো কাজ করেছে। তিনি বিশ্বাস করেন, সাহিত্যিকরা কেবল সমাজের আয়না নন, বরং তারা সমাজ পরিবর্তনের অন্যতম রূপকার। তার লেখনীতে এই মানবতাবদী, যুদ্ধবিরোধী চেতনা আরও ব্যাপক রূপ নিয়েছে ‘কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি’ কাবিতার কিতাবের মাধ্যমে। আণবিক যুদ্ধের ভয়াবহতা তাকে এতোটাই বিচলিত করছিলো যে তিনি বিশ্বজুড়ে চলা সংঘাতের বিরুদ্ধে এক বজ্রকণ্ঠ হয়ে উঠছিলেন। এই হাসাসিয়্যা তাকে একজন মানবতাবাদী বিশ্বনাগরিক হিশেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। এই লিখনির মাধ্যমে বিশ্বসাহিত্যের সমৃদ্ধ সাহিত্যকে বাংলাভাষী পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিতেও তিনি অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন। হাইনরীশ হাইনে, কাইফি আজমি এবং আহমদ ফরাজের মতো বিশ্ববরেণ্য কবিদের তরজমা করে তিনি বাংলা সাহিত্যের দিগন্তকে প্রসারিত করছেন। তার বহুভাষিক দক্ষতা বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে সেতুবন্ধন হিশেবে কাজ করেছে। তিনি মনে করেন, সাহিত্যের কোনো ভৌগোলিক সীমানা নাই যার ফলে তরজমার ভিতর দিয়া বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ফিকিরগুলো আমাদের নিজস্ব সম্পদে পরিণত হতে পারে।
আল মুজাহিদীর সাহিত্যিক অবদানের একটি বড় অংশ জুড়ে আছে শিশুসাহিত্য। ‘হালুম হুলুম’, ‘তালপাতার সেপাই’ এবং ‘শেকল কাটে খাঁচার পাখি’র মতো ছড়া ও কিশোর কবিতার বইগুলো শিশুদের কল্পনাজগতকে মুসরিন করেছে। তার শিশুসাহিত্যে একদিকে যেমন: লোকজ মেজাজ এবং গ্রামীণ ঐতিহ্যের ছোঁয়া পাওয়া যায়, অন্যদিকে তা শিশুদের মধ্যে দেশপ্রেম এবং উন্নত নৈতিক ইদরাকের বীজ বপন করে। আল মুজাহিদী মনে করেন, শিশুদের জন্য লেখা সবচেয়ে কঠিন কাজ, কারণ সেখানে সারল্য এবং গভীরতা- উভয়কেই সমানভাবে পালন করতে হয়। 
দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময়ের সাহিত্যিক সাধনা তাকে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত করেছে, যার মধ্যে ২০০৩ সালে প্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘একুশে পদক’ অন্যতম। মুজাহিদী গত তিনটি প্রজন্মের মধ্যে একটি উত্তরাধিকারের সূত্র হিশেবে কাজ করছেন। তার উপমা, রূপক এবং প্রতীকের ব্যবহার বাংলা কবিতায় এক ভিন্নমাত্রা সৃষ্টি করছে, যা তাকে পাঠকদের কাছে হৃদয়ভেদী ও আকর্ষণীয় করিয়া তুলছে।
পরিশেষে কওয়া যায়, আল মুজাহিদীর জেহেনে সমাজ ও সময় কেবল প্রতিচ্ছবি হিসেবে হাজির হয়নি, বরং তা এসেছে এক গভীর দায়বদ্ধতা এবং পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়া। তিনি ষাটের দশকের সেই সৃজনশীল আন্দোলনের রাহবার, যিনি কবিতাকে জমিনের কাছাকাছি নিয়ে আসছেন এবং সাংবাদিকতাকে সাহিত্যের এক অপরিহার্য তাআল্লুকে পরিণত করেছেন। তার সাহিত্যকর্ম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একজন সত্যিকারের সৃজন কারিগর কেবল তার নিজের সময়ের কাছে নয়, বরং অনাগত ভবিষ্যতের কাছেও দায়বদ্ধ। মানুষের জীবন ফানি হলেও সত্য এবং সৃষ্টির আলোক ইতিহাসে খালিদ হয়ে থাকে। আল মুজাহিদীর সৃষ্টি সেই খালিদত্ব সত্যেরই এক শিল্পরূপ, যা আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তার স্বকীয়তা ও গভীরতার জন্য মশহূদ হয়ে থাকবে। 

#মূলধারা
#আফসার_নিজাম
#afsar_nizam
#আফসারনিজাম
#afsarnizam
#সাহিত্য
#বাংলাসাহিত্য
#প্রবন্ধ
#আল_মুজাহিদী

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.