Header Ads

Header ADS

যাকিউল হক জাকী সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব তৈরির কারিগর ।। আফসার নিজাম



যাকিউল হক জাকী সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব তৈরির কারিগর
আফসার নিজাম

পহেলা বয়ান
যাকিউল হক জাকী সম্পর্কে আলাপ তোলা প্রয়োজন এ জন্য যে একজন সাংস্কৃতিক সংগঠক তার কাবিলা কিভাবে নির্মাণ করে তার চিত্র হাজির করা। যাতে করে পরবর্তীতে সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব তৈয়ার হওয়ার সময় সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়া যায়। যা পাঠের মাধ্যমে তরুণ নেতৃত্ব নিজেকে সমৃদ্ধ করতে পারে। আমরা যুগে যুগে সাংস্কৃতিক সংগঠকের ভূমিকা দেখতে পাই। তারা কিভাবে একটি সমাজকে পুনঃনির্মাণের নিয়ামক হয়ে ওঠে তার তালাশ আমাদের রাখা প্রয়োজন। নিজে একজন সংস্কৃতজন হয়ে ওঠার সাথে সাথে তার অনুসারী বা সহকারী তার মতোই তৈয়ার করার ইরাদাকে আমলে রূপান্তর করতে পারা যায়। যারফলে নিজে সমৃদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি পরবর্তী কওমের কাছে নেতৃত্বকে পৌঁছে দেয়া সহজ হয়। 
নেতৃত্ব তৈয়ারের বিষয়টি আমরা নবী ও রাসূলদের মাঝে দেখতে পাই। আমাদের জাতির পিতা ইবরাহীম আ. তার পুত্র ইসমাইল আ., ইয়াকুব আ. তার পুত্র ইউসুফ আ.। মুহাম্মদ সা. তাঁর সাথী আবু বকর, ওমর, আলী রা.কে দেখি। অপর দিকে সক্রেটিস তার সাথী প্লেটো, প্লেটো তার সাথী এরিস্টাটল। হাদীস সংগ্রাহক ইমাম বুখারী তার ছাত্রদের মধ্যে রয়েছেন ইমাম মুসলিম, ইমাম তিরমিজী এবং ইমাম নাসাঈ। লেলিনের উত্তরসুরী স্টালিন, ফিদের কাস্তোর উত্তরসুরী চেগুয়েভারা। এরকম ব্যক্তিত্ব তার রেপলিকা তৈয়ার করে। যে নেতৃত্ব নিজের রেপলিকা তৈয়ার করতে ব্যর্থ সে যেমন ক্ষতিগ্রস্থ হয় তেমনি তার কওমও ক্ষতিগ্রস্থ হয়। হাল আমলে আমরা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সংস্কৃতজন প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম তার সহযোদ্ধা অধ্যাপক শাহেদ আলী, অধ্যাপক আবদুল গফুরকে সামনে রাখতে পারি। আমরা সামনে রাখতে পারি সংস্কৃতি সাধক আবদুল মান্নান তালিব যার সহযোদ্ধা শাহ আবদুল হান্নান, অধ্যাপক মুহাম্মদ মতিউর রহমান, মোহাম্মদ আবদুল মান্নান ও মাহবুবুল হক প্রমুখ। পাকিস্তান আমল থেকেই তারা সংস্কৃতিকে উপস্থাপনের সাথে সাথে সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব তৈয়ার করতে সদা তৎপর ছিলেন। যার ছিলছিলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিয়া মুহাম্মদ আইউব তার উত্তরসুরী কবি হাসান আলীম, মতিউর রহমান মল্লিক। মল্লিক তার সাংস্কৃতিক জীবনে শুদ্ধ সংস্কৃতিকে বাংলাদেশের প্রান্তিক অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে ক্রমাগত চেষ্টা করে গেছেন। যেকজন মানুষ জীবনে সফল হয়েছে তাদের মধ্যে মল্লিকের নাম গণ্য হবে বলে আমি মনে করি। মল্লিক প্রান্তিক জনপদে সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে তার নেতৃত্ব দেয়ার মতো মানুষ তৈরির কারখানা খুলে বসে। সেই কারখানার একজন সংস্কৃতজন যাকিউল হক জাকী। পরবর্তীতে সে নিজেই একজন সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব তৈরির কারিগরে উপনিত হন।

দোসরা বায়ান
সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব একটি সমাজের চিন্তা, মনন, মূল্যবোধ, ধর্ম, সংস্কৃতি ও জীবনপ্রণালীকে সঠিক অভিমুখে চালিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। এই নেতৃত্ব কেবল প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনার দক্ষতা নয় বরং এটি জীবন প্রাণালী পরিচালনার জন্য শিল্প হিসেবে বিবেচিত। এই সংস্কৃতজনের বা নেতার প্রধান কাজ হলো উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়িত করার জন্য কর্মীদের উৎসাহিত ও পরিচালনা করা। পাশাপাশি দক্ষ ও সৃজনশীলন নেতেৃত্ব তৈরির জন্য নিবেদিত ব্যক্তিত্ব হিশেবে নিজেকে হাজির করা। সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়াকে ‘কারিগর’ শব্দের রূপকে ব্যাখ্যা করা যায়, কারণ এটি এমন একটি সক্রিয়, দীর্ঘমেয়াদি এবং সৃজনশীল প্রক্রিয়া যা সমাজের আদর্শগত কাঠামোকে নতুন নকশায় উপস্থাপন করে। বিদ্যমান প্রক্রিয়াকে প্রশ্ন করে চলমান পথের সম্পর্কে তরান্বিত করে। ঐতিহাসিকভাবে উল্লেখিত সংস্কৃতিজনেরা সাহিত্য, দর্শন ও কর্মের মাধ্যমে সমাজ ও সংস্কৃতির নকশা প্রণয়ন করেছেন। তারা কেবল নেতা ছিলেন না, তারা ছিলেন সেই কারিগর, যিনি জ্ঞান, মূল্যবোধ এবং প্রেষণার মতো উপাদানগুলিকে একত্রিত করে সমাজের নতুন কাঠামো তৈয়ার করে গেছেন। সংস্কৃতির কারিগর কখনোই নিজের স্বার্থকে সংগঠনের স্বার্থের ওপরে স্থাপন করেন না। সাংস্কৃতিক কারিগরের কাজ হলো ব্যক্তিগত লোভ, দাম্ভিকতা এবং অযোগ্যতা পরিহার করে দূরদৃষ্টির মাধ্যমে নেতৃত্ব তৈরির ভিত্তি স্থাপন করা, যা একটি নৈতিক ভিত্তি তৈয়ার করে। এই নৈতিক স্থাপত্যই প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের স্থিতিশীলতা ও সাফল্যকে মজবুত করে। নয়া কাঠামোর সংস্কৃতিকে মজবুত এবং নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টির মাধ্যমে নিজের অসমাপ্ত কার্যক্রমকে সামনের এগিয়ে নিতে সহায়তা করে।
মানুষের অর্জিত জ্ঞান, বিশ্বাস, শিল্পকলা, নৈতিকতা, আইন, রীতিনীতি এবং অন্য যেকোনো দক্ষতা ও অভ্যাসের জটিল সমষ্টির পরিবর্তন ও উৎকর্ষ সাধনের লক্ষ্যে কাজ করে। সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব মূলত প্রতীকী ও মূল্যবোধ-কেন্দ্রিক পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে সমাজের মূল্যবোধ, মানবিক কল্যাণ এবং আচরণের পরিবর্তনকে প্রভাবিত করে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব মোকাবিলা করার জন্য নিজেদের মধ্যে সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব তৈয়ার করার প্রয়াস যারি রাখে। যে যতো বেশি অনুসারী তৈয়ার করে এবং তার অনুসারীদের নেতৃত্ব দেয়ার জন্য নতুন নেতৃত্ব তৈয়ার করে সেই প্রকৃত সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব তৈরির কারিগর। জাকীর গুণাবলী মধ্যে সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব তৈরির গুণাবলী প্রকট ছিলো। 

তেসরা বয়ান
আমাদের আলাপ সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব তৈয়ার করার ফজিলত বয়ান করা। যাকে নিয়ে এই আলাপের সুত্রপাত তাকে একটু জেনে নিই। তিনি আমাদের সময়ে একজন অল্প সময়ের সফর করা সংস্কৃতিজন। প্রকৃতপক্ষে অধিক সৃজনশীল ও মননশীল ব্যক্তিরা অল্প সময়ে অধিক সময়ের কাজ সম্পদন করে পৃথিবী ত্যাগ করে। যাকিউল হক জাকীও তেমনি একজন সংস্কৃতজন। অল্প সময়ে পৃথিবীর সফর শেষ করেছে। তিনি বাংলাদেশের আদর্শ-ভিত্তিক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এক বহুমুখী ও প্রভাবশালী সংস্কৃতজন। তার সৃজনশীল কাজ সমাজে উপস্থাপিত না হলেও তিনি সৃজনশীলদের সৃজন উপস্থাপনের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। মানে একজন সফল সংগঠন হিশেবে সমাজে হাজির থেকেছেন। সংস্কৃতি সেবীদের সাথে থাকতে হলে নিজেও সৃজনশীল মানুষ হতে হয়। জাকী তার সৃজনশীলতার সাক্ষও রেখেছেন কবিতায়, সংগীতে, সাংবাদিকতায় সর্বপরি একজন সুসংগঠিত সাংস্কৃতিক নেতা হিশেবে। জাকী সর্বশেষ সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের দায়ত্ব পালন করেছেন ‘সাহিত্য সংস্কৃতি কেন্দ্র’র সভাপতি হিশেবে। তার ‘স্বপ্নচারী ও সম্মোহনী’ ব্যক্তিত্ব আদর্শ-কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক ধারাকে কেবল সৃজনশীল প্রেরণা দেয়নি বরং তাকে একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক রূপ দিয়েছে। তাঁর এই সমন্বিত পরিচয় তাঁর নেতৃত্বের বহুমাত্রিক প্রকৃতির ইঙ্গিত হাজির করেছ। আমরা জাকীর ব্যক্তিগত সৃজনশীলতা, সাংগঠনিক দূরদর্শিতা এবং আদর্শিক সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর সুদূরপ্রসারী প্রভাবকে আমরা হাজির করতে চেষ্টা করবো। এটা তার প্রতি আলাপের প্রথম ধাপ হিশেবে দেখতে পারি। সময়ের সাথে সাথে তার প্রতি পূর্ণ আলাপ হাজির হবে এটা আমরা বিশ্বাস করি। জাকী জন্মগ্রহণ করেন বগুড়া জেলার সোনাতলা গ্রামে ১৯৮৩ সালের ৩ জানুয়ারি। তিনি দীর্ঘদিন ধরে কিডনী ও হৃদরোগসহ জটিল রোগ নিয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইবনে সিনা হাসপাতালে ৩১ মে ২০২৫ শনিবার রাত ১০টায় ইন্তেকাল করেন। ১ জুন সকাল সাড়ে ৮ টায় নিজ জন্মভূমি বগুড়ায় দ্বিতীয় জানাজা ও বেলা সাড়ে ১০ টায় পৈতৃক ভূমি জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে তৃতীয় জানাজা শেষে পৈত্রিক গোরস্তানে মায়ের কবরের পাশে দাফন করা হয়।
একাডেমিক লেখাপড়া মানুষকে প্রকৃত মানুষ করে গড়ে তোলে না। আবার একজন মানুষকে সৃজনশীল ও মননশীল জনবান্দব নেতা হিশবেও গড়ে তোলে না। তার পরিবেশ, প্রতিবেশ সর্বপরি তার পরিবার যে আদর্শ চিন্তা মননে ধারণ করে তাকে সম্বল করে তার পথ নির্মাণ হয়। মাঝে মাঝে মানুষ সে পথ থেকে দূরে সরে যায়। কিন্তু প্রকৃত শিক্ষক বা নেতা যখন তার স্খলন অবলোকন করে তখন তাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে। সেই ফিরিয়ে আনার কাজটি জাকী সারা জীবন করেছন এবং তার মতো এমন নেতা তৈরি করতে কারিগরের কাজটি করে গেছেন। একাডেমির কাথা আলাপ করছিলাম। একাডেমিও মানুষে তার পথ বাতলে দেয়ার কাজটি করে। তার জন্য তাকে বিদ্যালয়ের চৌকাঠ পারি দিতে হয়। জাকী যে বিদ্যালয়ের চৌকাঠ পারি দিয়েছেন তাহলো তামিরুল মিল্লাত এবং ঢাকা আলিয়া মাদরাসা। মাদরাসাকেন্দ্রীক শিক্ষাজীবন তাঁর আদর্শিক অবস্থানের একটি শক্তিশালী ও সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়ে তুলেছিল। আদর্শ-ভিত্তিক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার উৎস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি কেবল ধর্মীয় জ্ঞান সরবরাহ করে না বরং একটি নির্দিষ্ট জীবনাদৃষ্টি এবং বৃহত্তর সামাজিক দায়বদ্ধতা তৈরি করে। জাকীর ক্ষেত্রে এই বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে। তার কাছে শিল্প ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম নিছক বিনোদনের মাধ্যম হাজির হয় না, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম তার কাছে একটি মূল্যবোধ-সংরক্ষণের মিশন বা বৃহত্তর আদর্শিক লক্ষ্য হিশেবে হাজির ছিলো। এটিই তাঁর স্বপ্নচারী নেতৃত্বের মূল প্রেরণা ছিলো বলে আমাদের কাছে প্রতিয়মান হয়।

চৌঠা বয়ান
ঢাকা আলীয়ায় পাঠের সময়ই তিনি ছাত্র রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন। সে সময় তার রাজনৈতিক আদর্শকে সৃজনশীলভাবে উপস্থাপনের জন্য সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে কাজ শুরু করেন। এ সময় জাকী উপলব্ধি করেন রাজনৈতিক কার্যক্রমে মানুষ যতো সহজে সম্পৃক্ত হয় সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে ততো সহজে সম্পৃক্ত হয় না। রাজনৈতিক কর্মী তৈয়ার হওয়া যতো সহজ সাংস্কৃতিক কর্মী তৈয়ার হওয়া ততো সহজ না। কর্মী তৈয়ার হইলেও নেতা তৈরি হতে বেশ সময় নেয়। বা নেতা হয়ে ওঠার আগেই তার ছাত্রজীবন শেষ হয়ে যায়। তিনি আর সংস্কৃতির বৃহৎ ময়দানের হাজির থাকে না। আবার রাজনৈতিক নেতারা যতোটা ব্যক্তিগতভাবে উদার সাংস্কৃতিক নেতারা ততোটাই জটিল। তারা চিন্তার জটিলতায় ঘোরপাক খায়। যেমন আল্লাহ সুরা আশ শুয়ারায় বলেন, ‘তোমরা কী দেখো না তারা উপতক্যায় উপতক্যায় ঘুরে বেড়ায়। আর তারা যা বলে তা করে না।’ এই চরিত্র অনেক আদর্শবাদী সংস্কৃতজনদের মধ্যেও বিরাজ করে। কারণ রাষ্ট্রের রন্দ্রে রন্দ্রে প্রবেশ করে আছে জাহেলী জীবনধারার অনুসঙ্গ। তার থেকে তারাও মুক্ত থাকতে পারছে না। সেই প্রেক্ষিতে তিনি তার কার্যক্রম সাংস্কৃতিক কর্মী না হয়ে সাংস্কৃতিক নেতা হওয়ার দিকে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন এবং নিজে নেতা হওয়ার সাথে সাথে নেতা তৈয়ার করার কারিগওে কাজটি বেচে নিয়েছেন। এ জন্য তিনি নিজে শিল্পী, কবি ও সাংবাদিকতার ব্যক্তিগত উৎকর্ষ সাধন না করে সামষ্ঠিক উৎকর্ষ সাধনে মনোনিবেশ করেছেন। 
আলীয়ার পরবর্তীতে জাকী বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী’র সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। এ দায়িত্ব পালনকালে জাকী প্রথমেই তাঁর শক্তিশালী সাংগঠনিক দক্ষতা এবং আদর্শিক প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে সংগঠনকে বিশ্বব্যাপী প্রচারের কাজে হাত দেন। তিনি ইসলামী সংস্কৃতির আধুনিক উপস্থাপনা, বিশেষ করে অডিও-ভিজ্যুয়াল প্রকাশনার ক্ষেত্রে সংগঠনটির অগ্রগতিকে সহজ করার কাজে যুক্ত হন। সাইমুমের অভিজ্ঞতাই সাংস্কৃতিক উৎপাদনকে একটি আদর্শিক লক্ষ্যের দিকে চালিত করার শক্তি অর্জন করেন। তার ভেতরকার দুর্বলতার প্রশ্নবিদ্ধ না করে তার থেকে শক্তি সঞ্চয় করে পরবর্তী সুযোগের অপেক্ষা করেন এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষমতা তার আওতায় আসার সাথে সাথেই তা প্রয়োগ করেন। 

পাঁচই বয়ান
সংস্কৃতিকে ভালোবাসার কারণে জাকী সংস্কৃতির বাইরের পেশাকে সচেতনভাবেই পরিহার করেছেন। আমরা আগেই বলেছি সাংস্কৃতিক কর্মীর অভাব না হলেও সাংস্কৃতিক নেতার অভাব সর্বকালেই পরিলক্ষিত হয়ে আসছে। সেই জায়গা পুরণের জন্য তিনি নিজেকে বৃহৎ ত্যাগের সামনে হাজির করেছেন। পেশাগত জীবনে মিডিয়ার কৌশলগত ব্যবহার করে জাকী ‘দিগন্ত টেলিভিশনের প্রযোজক ও আর্কাইভ ইনচার্জ’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। মূলধারার মিডিয়ায় এই ধরনের পেশাদার অভিজ্ঞতা অর্জন তাঁকে শিখিয়েছিলো কীভাবে উচ্চ পেশাদার মান বজায় রেখে ব্যাপকভাবে জনগণের কাছে সত্য বার্তা পৌঁছানো যায়। দিগন্ত টিভি বন্ধ হয়ে গেলে জাকী ‘সোনারগাঁও সমাচার’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে আদর্শিক ধারার প্রিন্ট মিডিয়াতে নেতৃত্ব দেয়। সাথে সাথে ‘আল মানার অডিও ভিজ্যুয়াল সেন্টার’র সিইও দায়িত্ব পালন করে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলকভাবে বৃহত্তর কিন্তু আদর্শিক ধারার প্রতি সহানুভূতিশীল প্ল্যাটফর্ম  বলে সমাজে হাজির ছিলো। জাকী এই আদর্শবাদী সংগঠন চালাতেই নয় বরং আধুনিক মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট এবং সাংবাদিকতার কৌশলগত দিকগুলির দক্ষতা অর্জন করে পরিচালনা করছেন। এই দক্ষতা তাঁকে আদর্শিক প্রকাশনাগুলোতে মানসম্পন্ন ব্যবস্থাপনার জন্য অপরিহার্য করে তোলে। এটি তাঁর ‘স্বপ্নচারী’ পরিচয়ের একটি ব্যবহারিক ও কার্যকর দিকও ছিলো।

ছয়ই বয়ান
জাকীর সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব মূল্যবোধকে কেন্দ্র করেই আবর্তন করছিলো। তাঁর কর্মজীবনটি কেবল শিল্প সৃষ্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং শিল্পকে একটি সামাজিক ও আদর্শিক পরিবর্তন আনার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের স্বপ্নের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলো। তাঁর অনুসারী ও সহকর্মীরা সমাজে ন্যায়, সমতা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছেন। যারা আদর্শ-ভিত্তিক সাংস্কৃতিক কার্যক্রম করে রাষ্ট্রকে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত করবে এটাই ছিলো তার মূল লক্ষ্য। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে শুধু কর্মী থাকলে চলতে পারে না। তার জন্য চাই প্রচুর নেতা, সাংস্কৃতিক নেতা। জাকী বিশ্বস করতো যদি সমাজে দশ জন নেতা থাকে তাদের সাথে কমপক্ষে একশজন কর্মী থাকবে। সেই জন্য তার লক্ষ ছিলো নেতা তৈয়ার করার দিকে। জাকী জানতো সৃজনশীল ও মননশীল সংস্কৃতিজনরা স্বাধীনচেতা। তারা তাদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ তারা পছন্দ করে না। সেই আলোকে জাকী তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতো। যাতে করে কোনো সংস্কৃতজন তার থেকে বা আন্দোলন থেকে বিমুখ হয়ে না যায়। জাকী জানতো একজন সংস্কৃতজন নেতা নিস্কৃয় হয়ে গেলে তার সাথে আরো কুড়ি জন নিস্কৃয় হয়ে যাবে। তখন সমাজের দুর্বল সাংস্কৃতিক নেতারা হাজির থাকবে। দুর্বল সৃজনশীল নেতৃত্ব মানে দুর্বল কর্মী আর দুর্বল কর্মী মানে দুর্বল সাংস্কৃতিক আন্দোলন। এরফলে একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক আন্দোলন পিছিয়ে পড়ে। এই উপলব্ধি জাকী আমৃত্যু লালন করেছে এবং শেষ পর্যন্ত সে সফল হয়েছেন। তার কারিগরি দক্ষতায় সর্বাধীক সাংস্কৃতি নেতৃত্ব তৈয়ার হয়েছে।
জাকী মনে করতো নেতৃত্বাধীন আদর্শ-ভিত্তিক সাংস্কৃতিক ধারার গুণী শিল্পী-সাহিত্যিকদের যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে আন্দোলনকে সফল করা সম্ভব। এখানে সে কোনো ধরণের বৈষম্য তৈয়ার করতো না বরঞ্চ বৈষম্য নিরসন করার সম্ভব্য সকল পন্থাই অবলম্বন করতো। একটি নির্দিষ্ট আদর্শিক প্রেক্ষাপটে সাংস্কৃতিক কর্মকার্যক্রমের মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়ের দাবি তোলার ওপর গুরুত্বারোপ প্রমাণ করে যে জাকী এবং তাঁর বৃত্তের সংস্কৃতিজনরা শিল্পের সামাজিক দায়বদ্ধতায় কতোটা অগ্রগামী ছিলো। জাকী তার সময়ে আদর্শ-ভিত্তিক আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক চালিকাশক্তি হিশেবেই হাজির ছিলো। তাঁকে একজন দূরদর্শী সংগঠক হিশেবেই জাতি চিরকাল মর্যাদার আসনে রাখবেন এটা আমরা হলফ করে বলতে পারি।

সাতই বয়ান
সাহিত্য সংস্কৃতি কেন্দ্রের দায়ত্ব পালন কালে জাকী সবচেয়ে সফলতা অর্জন করেছেন সাংস্কৃতিক কর্মীদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে। যেসকল সংস্কৃতজনেরা উপতক্যায় উপতক্যায় বিচরণ করতো তাদেরকে একই উপতক্যায় নিয়ে আসার কাজটি খুবই দক্ষতার সাথে আঞ্জাম দিয়েছেন। যেখানে সংস্কৃতজনরা বিভাজিত হয়ে থাকে, নেতৃত্বের হাল ছাড়তে অস্বীকার কওে, সেখানে একজন কর্মীকে তার নেতৃত্বের গুণাবালী পাঠ করে তার যোগ্য দায়িত্ব দিয়ে আদর্শিক সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে সময়ের চেয়েও সামনে এগিয়ে দিতে কাজ করেছেন। তার দায়িত্ব পালনের সময়টি ছিলো বাংলাদেশে আদর্শ চর্চার সবচেয়ে প্রতিকূল সময়। তথাপি সেই সময় সবচেয়ে বেশি সাংস্কৃতিক কর্মী সম্পৃক্ত হয়েছে তার আদর্শের সাথে। জাকী কী এই সকল কর্মীদের সম্পৃক্ত করেছে। না জাকী করেনি। জাকী ক্রমাগত নেতা তৈয়ার করার দিকে মনোযোগি হয়েছেন। যার মধ্যেই নেতৃত্বের গুণাবালী দেখেছেন তাকেই দায়িত্ব দিয়ে দিয়েছেন। এতে করে এক দিকে নেতা তৈয়ার হয়েছে অন্য দিকে সাংস্কৃতিক কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। নিঃসন্দেহে আদর্শ-ভিত্তিক, মূল্যবোধসম্পন্ন সংস্কৃতি বিকাশে তার কৌশল ছিলো সর্বোৎক্রিষ্ট। তাঁর এই সাংগঠনিক প্রভাবের নেটওয়ার্ক প্রমাণ করে সাহিত্য সংস্কৃতি কেন্দ্র আদর্শিক কাঠামোর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উইং। সাংস্কৃতিক অঙ্গণে এই ব্যাপক সাংগঠনিক নেতৃত্বের সমাগম নির্দেশ করে যাকিউল হক জাকীর সাংস্কৃতিক ভিত্তি এবং রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যেকার একটি সেতুবন্ধন ছিলো । 

আটই বয়ান
যাকিউল হক জাকী সাংগঠনিক জীবনে এমন এক সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিয়েছে, যা সমাজে বৈষম্য নিরসন এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠা করার আদর্শিক আহ্বানের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলো। মানুষের জীবনে সামাজিক ন্যায়ের চেতনা লালনের যে কথা বলা হয়েছে, জাকী সেই চেতনার ধারক ও বাহক ছিলো এবং সেই ধারার নেতৃত্ব তৈরির কারিগরও ছিলো। তার কার্যক্রেমের মধ্যে আদর্শিক ধারার শিল্পীরা ফ্যাসিস্টধারার স্বীকৃতি বা পৃষ্ঠপোষকতা না পেলেও, অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক কাঠামোর মাধ্যমে নিজেদের মূল্য প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলো। তার একমাত্র কারণ একই ধারার কর্মী ও নেতৃত্ব তৈয়ার করার ফল। এই জন্যই তাঁর স্বপ্নচারী নেতৃত্ব সাংস্কৃতিক কর্মধারাকে সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর অবদানকে রাজনৈতিকভাবে এবং গুণীজনদের মাধ্যমে মূল্যায়িত হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয়, তিনি কেবল একজন শিল্পী ছিলেন না; তিনি একটি বৃহত্তর আদর্শিক আন্দোলনের নৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুখপাত্র হিসেবে হাজির ছিলেন। সর্বপরি নেতাদের নেতা হিশেবে সাংস্কৃতিক অঙ্গণে বিচরণ করেছেন।

নয়ই বয়ান
যাকিউল হক জাকীর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হলো তাঁর প্রতিষ্ঠিত সাংগঠনিক নেতৃত্ব তৈরির মডেল। সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মাধ্যমে জাকী আদর্শভিত্তিক সাংস্কৃতিক আন্দোলন পরিচালনার জন্য একটি কার্যকর এবং পেশাদার মডেল প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন। তার জন্য যোগ্য উত্তসুরীও রেখে যেতে পেরেছেন। এই জন্য তার কর্মীদের মধ্যে নেতৃত্ব গ্রহণ করেছে শিল্পী, অভিনেতা, সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যিক থেকে শুরু করে উপস্থাপন সংস্কৃতির সকল শাখা। জাকীর জীবন ও কর্ম বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাই তার ব্যক্তিত্ব যিনি সৃজনশীলতা এবং বাস্তব সাংগঠনিক দক্ষতা সফলভাবে একীভূত। তাঁর সম্মোহনী নেতৃত্ব একটি আদর্শ-ভিত্তিক সাংস্কৃতিক ধারাকে কেবল সৃজনশীলভাবে উন্নত করেনি, বরং এটিকে সাংগঠনিক এবং ভৌগোলিকভাবেও সম্প্রসারিত করেছিলো। তাঁর সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব তৈরি ও নির্বাচন এবং তাঁর সাংগঠনিক মডেলের উপর গভীর অধ্যয়ন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং তাঁর পেশাদার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের সাংস্কৃতিক কর্মীদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা আবশ্যক। যাকিউল হক জাকী সাংস্কৃতিক কর্মীদের জন্য এক উদাহরণ রেখে গেলো- আদর্শ ও পেশাদারি নেতৃত্বের সমন্বয়ের মাধ্যমে কিভাবে সংস্কৃতির শক্তিকে একটি বৃহত্তর সামাজিক লক্ষ্যে ব্যবহার করা যায়।

#মূলধারা
#আফসার_নিজাম
#afsar_nizam
#আফসারনিজাম
#afsarnizam
#সাহিত্য
#বাংলাসাহিত্য
#প্রবন্ধ
#যাকিউল_হক_জাকী

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.