সোলায়মান আহসানের 'বিশ শতকের ইশতেহার' কবিতার নান্দনিক ও রাজনৈতিক ব্যবচ্ছেদ ।। আফসার নিজাম
বিশ শতকের শেষাশেষি দুনিয়াজুড়ে রাজনীতি, অর্থনীতি আর মানবিক মূল্যবোধের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ও ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময় অতিবাহিত করছে। তার আঁচ আইসা লাগছিল আমাদের এই পলিমাটির দেশেও। একদিকে বিজ্ঞান আর টেকনোলজির চরম বিকাশ, অন্যদিকে দুই-দুডা মহাযুদ্ধ, হিরোশিমা-নাগাসাকির দোজখি আগুন আর কোল্ড ওয়ারের জমানায় নয়া-সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন মানব সভ্যতাকে এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি খাড়া করায়া দিছিল। এই যে দুনিয়াদারির তাবৎ জুলুম আর জবরদস্তি, এর চোট সবচেয়ে বেশি লাগছে থার্ড ওয়ার্ল্ড বা আমাদের এই তৃতীয় বিশ্বের সংবেদনশীল বুদ্ধিজীবী, কবি-সাহিত্যিকদের দিলে। সেই জমানার একনিষ্ঠ ও শক্তিমান কবি হইলেন সোলায়মান আহসান। যার কলম থিকা বাইর হইছিল সৃষ্টিশীলতার এক অনন্য ও কালজয়ী নিদর্শন ‘বিশ শতকের ইশতেহার’। এই কবিতা খালি এক ক্ষুব্ধ কবির ব্যক্তিগত বিলাপ না, কিংবা কোনো কমজোর কবির ব্যক্তিগত বিলাপ না; এই কবিতাটি হইলো তৃতীয় বিশ্বের এক্কেবারে খাস দেউড়ি থিকা আসা ইনসাফের আওয়াজ ও সংবেদনশীল মানুষের আত্মদহন, অস্তিত্ববাদী সংকট আর বৈশ্বিক শক্তির অসম সমীকরণের বিরুদ্ধে এক নান্দনিক ইশতেহার। যা পোস্ট-কলোনিয়াল ক্রাইসিস আর ইসলামী নন্দনতত্ত্বের বিচার করলে দেখা যায়, কবিতাটি একদিকে যেমন শোষিত মানুষের হৃদয়ের অব্যক্ত আর্তনাদকে জেহেনে ধারণ করে, অন্যদিকে সামরিকায়ন ও পুঁজিতন্ত্রের নির্মম বাস্তবতাকে উদাম কইরা দেয়।
আশির দশকের বাংলা কবিতা নানা মতাদর্শ, নানা ইজম আর নানা প্রতিবাদের ভাষায় সরগরম আছিল বটে, কিন্তু সেই কোলাহলের মাঝখানে কবি সোলায়মান আহসান খুঁজছিলেন অন্য এক দিশা- যেই দিশার কেন্দ্রবিন্দুতে আছিল বিশ্বাস, আত্মিক জাগরণ আর মানুষের অন্তর্জগতের রূহানিয়াত। সেই রূহানিয়াত দর্শনের একখানা জবরদোস্ত বয়াননামা এই কবিতা ‘বিশ শতকের ইশতেহার’। একজন সোলায়মান আহসান বাংলার সাহিত্য আসমানে চটজলদি পয়দা হয় নাই। চার দশকেরও বেশি সময় ধইরা তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্দরে-মহলে নিজের ক্ষুরধার মগজ আর দিলের কারিগরি দিয়া এক আলাদাই শান জাহির করছেন।
সোলায়মান আহসানের বাপদাদার ভিটা আছিল সিলেটের পুণ্যভূমিতে, কিন্তু তার দিল আর দৌড়াদৌড়ি আছিল ঢাকা থিকা সিলেট, সিলেট থেইকা পুরা বাংলাদেশের তল্লাটজুড়ে। সেই আশির দশকে যখন ছোকরাদের মনে নতুন কিছু করার জ্বীন ভর করে, তখন তিনি সিলেটের ‘সংলাপ সাহিত্য-সংস্কৃতি ফ্রন্ট’-এর সেক্রেটারির গদিতে বইসা নতুন একঝাঁক কলমবাজদের নেতৃত্ব দেন। সে সময় তার মাথার ওপর ছায়া দিয়া খাড়ায়া ছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি খোদ আল মাহমুদ। আর অভিভাবকের আশা হাতে কবি আফজাল চৌধুরীর মতো মস্ত বড় সমাজচিন্তক ও দার্শনিক। এই যে গুণী মানুষের সোহবত, এতে কবির দিলের খুদকুঁড়ো এক্কেবারে খাঁটি সোনায় রূপ নিছিল।
সোলায়মান আহসানের সাহিত্যকর্মের পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। তিনি একাধারে কবি, কথাসাহিত্যিক, ছোটদের মায়াবী দুনিয়ার সর্দার আর পুরোদস্তুর লেখক ও সাংবাদিক। তার কথাসাহিত্য ও কবিতা’র ভিতরে আছে মানবিক আখলাক, পোস্ট-কলোনিয়াল প্রতিবাদের গরম মশলা, গভীর বিশ্বাস আর নৈতিক মূল্যবোধের শৈল্পিক উচ্চারণ, অন্যদিকে আছে সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ শব্দাবলী আর আধুনিক রূপক ও উপমার সাহায্যে ঐতিহ্য ব্যবহার পাঠককে এক্কেবারে তাজ্জব বানায়া দেয়। বোদ্ধা লোকেরা কন, তার কবিতার চালচলন নাকি পাহাড়ি নদীর মতো। কোথাও এক্কেবারে খামোশ, গভীর পানির মতো শান্ত, আবার কোথাও শোষণের বিরুদ্ধে এক্কেবারে ফুঁইসা ওঠা বিপ্লবী তুফান। সেই তুফানেরই আখেরি দলিল হইলো এই ‘বিশ শতকের ইশতেহার’।
‘ইশতেহার’ বা ‘ম্যানিফেস্টো’ শব্দটার পিছনে একটি রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব জড়াইয়া আছে! ১৮৪৮ সালে কার্ল মার্ক্স আর ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস যখন ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ ছাইড়া দুনিয়ার মজদুরদের এক হইতে ডাক দিলেন, তখন থিকাই এই শব্দটা শোষিত মানুষের তকদির বদলানোর এক বিপ্লবী হাতিয়ার হইয়া উঠছে। সোলায়মান আহসান যখন কবিতার নাম দিলেন ‘বিশ শতকের ইশতেহার’, তিনি মূলত সেই পলিটিক্যাল হাতিয়ারটাকেই কবিতার নান্দনিকতায় রূপান্তর করলেন। কারণ বিশ শতকটা আছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও দ্বান্দ্বিক সময়কাল। এ শতাব্দীর একদিকে প্রযুক্তি চরম শিখরে উঠায়া গেল, মানুষ চান্দে গিয়া নামল, বড় বড় কলকারখানা বানাইল, আবার অন্যদিকে বাধাইয়া দিল দুইটা বিশ্বযুদ্ধ, হিরোশিমা-নাগাসাকির পারমাণবিক বোমা মাইরা মানুষ খতম করল, ফিলিস্তিন, কাশ্মীর আর ভিয়েতনামের মাটিকে বানাইল লাশের ডেরি। এই যে তামাম দুনিয়ার পুঁজিবাদী, সমাজবাদী, ফ্যাসিস্ট, স্বৈরশাকরা শান্তির খোয়াব দেখায়া তলে তলে মিসাইল আর কামানের গোলা সাপ্লাই করতেছিল, কবি সেটা খুব নিবিড়ভাবে দেখছেন। তিনি দেখলেন, যুক্তি-তক্কো আর মহব্বতের মতো দিলের খাস চিজগুলো আজকালকার জমানায় স্রেফ উপহাস ছাড়া কিছু না, আসল কারিশমা হইলো বন্দুকের নল আর বারুদের গন্ধ। তাই এই কবিতা স্রেফ কোনো শ্লোক না, এটা হইলো উল্টা এক ম্যানিফেস্টো বা কাউন্টার-ম্যানিফেস্টো। কবিতাটির মূল দার্শনিক রূপরেখাটি গইড়া উঠছে সেই মৌলিক সওয়ালের ওপর: যেইখানে বৈশ্বিক ব্যবস্থাটি পরিচালিত হয় বেইনসাফী দ্বারা। এমন বিক্ষুব্ধ সময়ে একজন সংবেদনশীল মানুষের পক্ষে লেখা সম্ভব ‘বিশ শতকের ইশতেহার’। আজ কবিতাটি এমন এক শতাব্দীর দলিল হিশাবে হাজির করছে যেইখানে শান্তি শ্রেফ এক অলীক ঘোষণা, শক্তিই হইলো একমাত্র সত্য।
কবিতার শুরুতেই কবি যে খেদ আর গুসসা উগড়ায়ে দিছেন, তা শুনলে গায়ের পশম খাড়া হইয়া যায়। কবি আফসোস কইরা কইতাছেন, ‘‘মাঝে মাঝে বড় ক্ষোভ জাগে/ আমি কেন হলাম না একজন যুদ্ধবাজ সৈনিক/ আমার হাতে যদি থাকতো একটা কলমের পরিবর্তে/ অত্যাধুনিক মেশিনগান, অথবা এন্টিএয়ারগানের ট্রিগারে/ এই ব্যাকুল আঙ্গুলগুলো’’ এই যে আক্ষেপ, এটা কিন্তু কোনো সীমারের যুদ্ধকামী বা সহিংস মনোভাব না, এটা হইলো একজন চরম অসহায় সৃষ্টিশীল মানুষের এক ধরণের আত্মপ্রতিরক্ষামূলক ক্ষোভ। কবি অনুভব করছেন, দুনিয়ার হিংস্র ও যুদ্ধোন্মাদেরা অত্যাধুনিক মেশিনগান আর এয়ারগানের ট্রিগারে আঙ্গুল ছোঁয়াইয়া গদি ওল্টায়া দিতাছে, তখন কবির হাতের এই সরু কলমটা এক্কেবারে অপ্রাসঙ্গিক ও অকার্যকর ঠেকতাছে। দিলের ভেতরে যে ক্ষোভের ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি বা ভিসুভিয়াস জমা হইয়া আছে, তা এই ঠাণ্ডা কালির লেখায় প্রকাশ করা সম্ভব হইতাছে না। যদি তিনি সৈনিক হইতেন, তবে হয়তো সেই ক্ষোভ ‘‘নায়াগ্রা জলপ্রপাতের মত ভেঙে-চুরে দিতে পারত/ হৃদয়ের গিরিপথ- তাবৎ সংকীর্ণতা’’ শেষ কইরা দিতে পারত। এখানেই কবি এক প্রতীকী কায়দায় কলম আর তলোয়ারের দস্তাবেজ খাড়া করছেন। কলম তো হইলো বুদ্ধি, আখলাক আর তাহজিবের নিশানা; আর মেশিনগান হইলো জানোয়ারের মতো গায়ের জোর আর ধ্বংসের তিলক। যখন প্রজ্ঞার সাথে এই দুই শক্তির কুস্তি লাগে, কবি কোনো জুতসই জওয়াব পান না। কলম যেখানে শান্তির বাগান বানাইতে চায়, যুদ্ধাস্ত্র সেখানে হিরোশিমার ছাই ওড়ায়। সমাজেও কলমধারীর ইজ্জত এখন এক্কেবারে সস্তা, লোকে তারে বিত্তহীন চিত্তের বড়াই করা এক অসহায় মানুষ বইলা তালি মারে, আর অন্যপিঠে লাখ টাকার মিসাইল গোটা দেশকে বন্ধক রাখার মতো ক্ষমতা রাখে। এই বাজার-অর্থনীতির জমানায় কবি নিজেকে যখন ‘স্থূল কলম অধিকারী অসহায় জীব’ বইলা মশকারা করেন, তখন তার চারপাশে এক নিষ্ঠুর হাসির ফোয়ারা ছোটে। পাড়ার দোস্তরা হাসে, এমনকি বিলাতি কায়দার ‘সাম্রাজ্যবাদি সুন্দরী নারীরাও’ চোখ টিপে, আর মুদ্রাস্ফীতিতে পইড়া যাওয়া এই খতরনাক সমাজটা কবির ইনসাফ কায়েম আর শান্তির বুলি শুইনা মুখ বাঁকায়। ‘‘জানি মানুষের হিংস্রতা ক্রোধ মদমত্ততা ভালোবাসার/ এই উদ্যানে সংকুলান হবে না কখনো’’ এই পুঁজিবাদী ও চরম ভোগবাদী সমাজব্যবস্থায় আদর্শবাদী কবির অবস্থান অত্যন্ত প্রান্তিক ও শোষিত।
কবিতাটির দ্বিতীয় স্তবকে কবি সমসাময়িক সামাজিক অবক্ষয় আর বৈশ্বিক অর্থনীতির যে নগ্ন রূপ, তা কবি বড় খোলতাই কইরা দেখাইছেন। এই যে ‘‘মুদ্রাস্ফীতির সমাজ? বিশ্রী’’ উক্তিটা, এটা স্রেফ বাজারের চাল-ডালের দাম বাড়ার গল্প না; এইটা হইলো মানুষের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অবনতি আর মানবিক মূল্যবোধ ও ঈমান বিক্রির খতিয়ান। যে সমাজে মানুষের নীতিনৈতিকতা আর মানবিক মূল্যবোধে কোনো কদর নাই, সবকিছু যেখানে স্রেফ নোটের বান্ডিলে মাপা হয়, কবি নিজের বিত্তহীনতা এবং চিত্তের বড়াইয়ের বৈপরীত্যকে অত্যন্ত বেদনার লগে তুলে ধরছেন, “আমার বিত্ত নেই চিত্তের বড়াই করি বেহুদা”। এদিকে আবার বিশ্ব রাজনীতির ভণ্ডামি ও সাম্রাজ্যবাদী চরিত্রকে কবি উদলা কইরা দেখান। যখন “হিটলারের কাহিনী’’ আর “আনবিক বোমার ধ্বংস ইতিহাস” ঘাঁইটা দুনিয়া শান্ত করার প্রেসক্রিপশন লেখেন, তখন সাম্রাজ্যবাদী ও পুঁজিবাদী শক্তিগুলা কবিকে একজন “পরাজিত সৈনিক” হিশাবে উপহাস করে। এই পুঁজিবাদী শোষণের তীব্রতা এতটাই প্রকট যে তেলসমৃদ্ধ আরব দেশগুলোর বিপুল ধনসম্পদ থাকলেও তারা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের কাছে নতজানু। তারা তৃতীয় বিশ্বের মেধা ও তারুণ্যকে রক্ষা করতে সম্পূর্ণ বেখেয়াল। মধ্যপ্রাচ্যের স্বধর্মের সেই আমির-ওমরাহদের কারুনি সম্পদ এই কবির দিলের তামান্না পূরণ করতে পারে না। তখন থার্ড ওয়ার্ল্ডের এক কোণায় পইড়া থাকা কবির মনে হয়, যুদ্ধাস্ত্রের তালিম না নিয়া এই সৃজনশীল চর্চায় নিজের তারুণ্যকে ব্যয় করাটাই আছিল তার ঐতিহাসিক ভুল। তিনি খুব আফসোস কইরা কন, ‘‘তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল? দেশের একজন যুবক হয়ে/ আমার তারুণ্যকে বিপথগামী করেছি/ আমার যৌবন সাহস ব্যয়িত হওয়া উচিত ছিল যুদ্ধাস্ত্র চর্চায়/ কেননা যেখানে কলম নয় যুদ্ধাস্ত্র/ যুক্তি নয় শক্তি/ স্বস্তি নয় অস্থিরতা/ জনগণ নয় ব্যক্তি/ আর আদর্শ নয় অনাদর্শ মোক্ষম সর্বদিকে।’’ এই যে হতাশার বয়ান, এ তো কেবল একজনের না, এইটা হইলো তৃতীয় বিশ্বের সেইসব যুবকদের মনস্তাত্ত্বিক অবক্ষয়, যারা সিস্টেমের জাঁতাকলে পইড়া নিজের মেধা আর সৃষ্টিশীলতাকে অপচয় হিশাবে ভাবতে বাধ্য হইছে।
কিন্তু তাই বইলা সোলায়মান আহসান স্রেফ পরাজিত হইয়া যাইব তেমন কবি না। তিনি এই মাটিরই সন্তান, মুসলমানের বেটা। যার স্মৃতিতে জমা আছে ১৯৭১ সালের সেই তপ্ত দুপুরের বারুদ। তিনি স্মৃতির সিন্দুক থিকা তুইলা আনেন সেই গৌরবময় প্রতিরোধ সংগ্রামের ইতিহাস, যখন এদেশের দামাল ছেলেরা বুকের ছাতি টান কইরা খাড়াইছিল। কবি লেখেন, ‘‘যেভাবে বুকে স্টেন চেপে ধূসরিত জনপদে শব্দ ছড়িয়েছিলাম/ সচকিত করেছিলাম বিজয়ের আনন্দে চিৎকারে...’’ স্টেনগান যেমন সীসার বুলেট দিয়া শত্রু সাবাড় করে, কবিরা তেমনি “বুকের স্টেন চেপে” শব্দের কার্তুজ দিয়া মানুষের মনে আজাদির বীজ বপন করছিলেন। একাত্তরের সেই লড়াই ছিল হকের লড়াই, ইনসাফের লড়াই। কিন্তু আফসোস, আজাদির এত বছর পরও সেই স্বপ্নগুলা বৈশ্বিক বাস্তবতায় আজ মুক্তি-সংগ্রামের আদর্শ চরম সংকটের গুদামে আটকা পইড়া গেছে। যে মুক্তির আনন্দে মানুষ আসমান ফাটায়া চিৎকার করছিল, আজ তা কর্পোরেট শোষণের চাদরে ঢাকা। তাই কবির দিল আজ আবার ফুঁইসা উঠছে। তিনি আর শান্তির ফাঁকা বুলি বা নিষ্ফল কাসিদা গাইতে চান না, তিনি এখন শোষকদের গদি কাঁপাইতে এক্কেবারে ‘বুলেট’ চান। তার সাফ কথা, “বলতে ইচ্ছে হয়, ভাইসব, আমি কলমের পরিবর্তে যুদ্ধাস্ত্র চাই;/ চাই আমার যন্ত্রণার চির অবসানে একটি কাব্য নয় বুলেট।” এই যে ক্ষতায়নের বয়ান, এ থিকা বোঝা যায়, যখন মাজলুম মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেইকা যায়, তখন শান্তি-শান্তি খেলা বাদ দিয়া সশস্ত্র প্রতিরোধই একমাত্র অনিবার্য পথ হইয়া খাড়ায়।
কবিতাটির সবচেয়ে আধুনিক এবং মনস্তাত্ত্বিক কায়দাটা আসে যখন কবির ভেতরের বিপ্লবী সত্তা সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য আকুল হইয়া ওঠে, ঠিক তখনই তার ভেতরের এক মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা তাকে আটকায়া দেয়। কবি চমকায়া উঠে বলেন, ‘‘কিন্তু আমার বিবেক নামক স্বয়ংক্রিয় কম্পিউটারটি এর/ বিপরীত রায় দিল’’ এইখানে আইসা কবি বিশ শতকের টেকনোলজিকে মনের ভেতরের ঈমান আর বিবেকের সাথে মিলায়া দিলেন। কম্পিউটার যেমন রাগ-অনুরাগের তোয়াক্কা না কইরা, ডেটা বিশ্লেষণ কইরা এক্কেরে নিখুঁত রেজাল্ট দেয়, কবির বিবেকও তেমনি সমস্ত ক্ষোভ ও বঞ্চনার মুখে খাড়ায়া আসল সত্যটা বাৎলায়া দেয়। বিবেক কবিকে মনে করাইয়া দেয়, যুদ্ধাস্ত্রের সহিংসতা দিয়া হয়তো কেল্লা ফতে করা যায়, কিন্তু স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা যায় না। হিংসার বদলে হিংসা আনলে দুনিয়াটা স্রেফ এক অন্ধ কসাইখানা হইব। মানুষের হাজার বছরের তাহজিব-তমদ্দুন আর সৃজনশীলতা এক নিমেষে খতম হইয়া যাইব। এই ইলহাম আসতেই কবি আবার তার সেই আদি জমিনে ফেরত আসেন। তিনি যুদ্ধাস্ত্র হাতে তুইলা নেন না, বরং তার সেই ‘স্থুল কলমকেই’ আবার ঘষে ঘষে শাণিত করতে বসেন। কবি তামান্না রাখেন, “তাই আজো আমার স্থুল কলমকে ঘষে ঘষে/ একটা মিসাইলের তীক্ষ্ণতা সৃষ্টিতে প্রয়াসী’’ অর্থাৎ, বন্দুকের নলে না, শব্দের ভিতর এমন বারুদ ভরতে হইব যা দিয়া মিসাইলের মতো জালিমের শাসকের মসনদ কাঁইপা ওঠে। এই যে নান্দনিক প্রতিরোধ বা অ্যাথলেটিক রেজিস্ট্যান্স, এটাই হইল কবির আসল কেরামতি। সে জানে বুলেটের আয়ু তো কয়েক সেকেন্ডের, কিন্তু কালির দাগ যে কেয়ামত পর্যন্ত!
কিন্তু এই নান্দনিক প্রতিরোধের শেষেই লুকায়া আছে এক অমোঘ ও বিষণ্ণ ট্র্যাজেডি, যা কলিজা ঝাঁঝরা কইরা দেয়। কবি যখন কলমকে শান দেন, তখনই মনের অবচেতনে ভাইসা ওঠে এক চরম সত্য: “যদিও আমি স্বভাবতই জানি/ বড়জোর একটি মিসাইলের দামে বিক্রিত স্বদেশ/ আমার প্রিয় মাতৃভূমি।’’ এই একটা লাইনেই সোলায়মান আহসান সমকালীন বিশ্বব্যবস্থায় তৃতীয় বিশ্বের সার্বভৌমত্বের রাজনীতি, সোশ্যালিজম আর ক্যাপিটালিজমের নগ্ন রূপটা খোলসা কইরা দিলেন। দুনিয়ার বড় বড় অস্ত্রের ব্যবসায়ী ও সাম্রাজ্যবাদীরা যে মরণাস্ত্রের বাজার সাজায়া রাখছে, সেখানে একটা মিসাইলের দাম, তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির চাইতেও বেশি। পুঁজিবাদী ও সামরিক পরাশক্তিগুলো চাইলে এক পলকে একটি গরিব দেশকে কিনা নিতে পারে। এই যে গ্লোবাল খবরদারী। এই নির্মম বাস্তবতার সামনে খাড়াইয়া কবির কলমকে মিসাইলের তীক্ষ্ণতা দেওয়ার প্রচেষ্টা অত্যন্ত ট্রাজিক এবং অসহায় বলাই মনে হয়।
সোলায়মান আহসান ‘বিশ শতকের ইশতেহার’রে যে সমস্ত রূপক আর উপমা ব্যবহার করছেন, তা এক কথায় লা-জওয়াব। “তবু আমি আলিফের মত একটা কলম ধারণ করে/ খাড়া দাঁড়িয়ে আছি” আরবি হরফের প্রথম অক্ষর আলিফ যেমন এক্কেবারে সোজা, খাড়া, কবিও তেমনি সমস্ত দারিদ্র্য আর উপহাসের মুখে নিজের নৈতিকতা নিয়া আলিফের মতোই সোজা হইয়া খাড়ায়া আছেন। আবার ‘বিবেক নামক স্বয়ংক্রিয় কম্পিউটার’ উপমাটি আমাদের জমানার আধুনিক মনস্তত্ত্বের এক চমৎকার নিশানা। আর সবশেষে ‘একটি মিসাইলের দামে বিক্রিত স্বদেশ’ তো একবিংশ শতাব্দীর এই কর্পোরেট গোলামির জমানার সবচেয়ে বড় সত্য। সব মিলায়া, ‘বিশ শতকের ইশতেহার’ কেবল এক জমানার খতিয়ান না, এ হইলো চিরকালের শোষিত মানুষের দগ্ধ দিলের এক ইশতেহার। আজ ২০২৬ সালেও যখন দুনিয়ার কোনো না কোনো কোণায় বোমার আওয়াজ পাওয়া যায়, যখন পুঁজিপতিদের বাজারে মানুষের দাম সস্তা হয়, তখন সোলায়মান আহসানের এই কবিতা আমাদের মনে করায়া দেয়- চারপাশে যত মিসাইলের আস্ফালন থাকুক না কেন, শেষ পর্যন্ত মানুষের এই বিবেক আর কলমের তীক্ষ্ণতাটুকুই আমাদের বাঁচায়া রাখবে, কারণ কলমের কালির জোর কোনোদিন ফুরায় না।
বিশ শতকের ইশতেহার
সোলায়মান আহসান
মাঝে মাঝে বড় ক্ষোভ জাগে
আমি কেন হলাম না একজন যুদ্ধবাজ সৈনিক
আমার হাতে যদি থাকতো একটা কলমের পরিবর্তে
অত্যাধুনিক মেশিনগান, অথবা এন্টিএয়ারগানের ট্রিগারে
এই ব্যাকুল আঙ্গুলগুলো
তবে হয়তো হৃদয়ের ঘুমন্ত ভিসুবিয়াসটা
জেগে উঠতে পারতো সম্পূর্ণ পারঙ্গম হয়ে
কিংবা নায়াগ্রা জলপ্রপাতের মত ভেঙে-চুরে দিতে পারত
হৃদয়ের গিরিপথ- তাবৎ সংকীর্ণতা
কোনটা শক্তিধর? একটা কলম, না মেশিনগান?
মাঝে মাঝে প্রশ্ন রাখি আমি প্রজ্ঞার কাছে
তুমুল বিতর্ক হয়। সঠিক জবাব পাই না। আফসোস।
কখনো নিজেকে একটা স্থূল কলম অধিকারী অসহায়
জীব ভেবে উপহাস করি,
বন্ধুরাও হাসেন যত্রতত্র, সাম্রাজ্যবাদী সুন্দরী নারীরাও;
আর মুদ্রাস্ফীতির সমাজ? বিশ্রী ঠা ঠা হাসিতে
ফেটে পড়ে আদিগন্ত।
তবু আমি আলিফের মত একটা কলম ধারণ করে
খাড়া দাঁড়িয়ে আছি
আমার বিত্ত নেই, চিত্তের বড়াই করি বেহুদা।
আমি দ্বিতীয় মহাসমরের নায়ক হিটলারের কাহিনী
পড়তে পড়তে
কিংবা আনবিক বোমার ধ্বংস ইতিহাস ঘাঁটতে ঘাঁটতে
কলমের কালো আঁচড়ে একটি শান্তির উদ্যান রচনা করি
জানি মানুষের হিংস্রতা ক্রোধ মদমত্ততা ভালোবাসার
এই উদ্যানে সংকুলান হবে না কখনো
আর ঐ স্থুল কলমের দামে কিনতে চাই আমি
গোটা পৃথিবীর পারমানবিক শক্তিধর তাবৎ সমরাস্ত্রকে।
কিন্তু হায়! আমার প্রিয়জনরা, যারা শান্তির কপোত উড়াতে ব্যস্ত
আমাকে একটা পরাজিত সৈনিক হিসেবে চিত্রিত করে হাসে
হাসতে হাসতে তারা ইতিহাসের এন্তার নজীর তুলে
আমার সুকুমার বৃত্তির যাচাইয়ে হয় নিয়োজিত।
কখনো আমার মনে হয় আমি কলমকে ধারণ করে
ক্ষমাহীন অপরাধ করেছি।
যে অপরাধের খেসারত পূরণে তেল সমৃদ্ধ দেশের
আনুকূল্যও অক্ষম।
তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল? দেশের একজন যুবক হয়ে
আমার তারুণ্যকে বিপথগামী করেছি
আমার যৌবন সাহস ব্যয়িত হওয়া উচিত ছিল যুদ্ধাস্ত্র চর্চায়
কেননা যেখানে কলম নয় যুদ্ধাস্ত্র
যুক্তি নয় শক্তি
স্বস্তি নয় অস্থিরতা
জনগণ নয় ব্যক্তি
আর আদর্শ নয় অনাদর্শ মোক্ষম সর্বদিকে।
আমার তাই মনে হয় সেই যে একাত্তরে
যেভাবে বুকে স্টেন চেপে ধূসরিত জনপদে শব্দ ছড়িয়েছিলাম
সচকিত করেছিলাম বিজয়ের আনন্দে চিৎকারে
বলতে ইচ্ছে হয়, ভাইসব, আমি কলমের পরিবর্তে যুদ্ধাস্ত্র চাই;
চাই আমার যন্ত্রণার চির অবসানে একটি কাব্য নয় বুলেট
কিন্তু আমার বিবেক নামক স্বয়ংক্রিয় কম্পিউটারটি এর
বিপরীত রায় দিল
আর তাই আজো আমার স্থুল কলমকে ঘষে ঘষে
একটা মিসাইলের তীক্ষ্ণতা সৃষ্টিতে প্রয়াসী
যদিও আমি স্বভাবতই জানি
বড়জোর একটি মিসাইলের দামে বিক্রিত স্বদেশ
কোন মন্তব্য নেই