নজরুলের রাজনৈতিক দর্শন ও রাষ্ট্রভাবনা ।। আফসার নিজাম
আফসার নিজাম
বিশ শতকের প্রথমার্ধ যখন গোটা দুনিয়ার বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক পটভূমি একটি গুরুত্বপূর্ণ কেরফা হিশাবে কাজ করতাছিল, ঠিক তখনই কাজী নজরুল ইসলামের আবির্ভাব। এইটা কোনো আসমানি কাণ্ড আছিল না, এর পিছনে আছিল জবরদস্ত ঐতিহাসিক অনুঘটক। ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড ওয়ারের পরের ঔপনিবেশিক পরাধীনতা, তীব্র অর্থনৈতিক মন্দা, খেলাফত আন্দোলন আর ১৯১৭ সালের রুশ দেশের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের যে অভিঘাত, এইসব মিইলা সেই আমলের অবিভক্ত ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তাধারাকে আমূল পাল্টায়া দিছিল। ঐতিহাসিক এই যুগসন্ধিক্ষণে নজরুলের রাষ্ট্রভাবনা স্রেফ কবিদের খায়েশ বা সাহিত্যিক ভাববিলাসের চশমা দিয়া দেখলে চরম ভুল হইবো। এইটা আছিল আসলে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে এক আপসহীন রাজনৈতিক ও দার্শনিক প্রতিরোধের সুসংগঠিত ইশতেহার। নজরুল ইসলামের রাষ্ট্রভাবনার আদি প্রশ্ন আর কোশেশ আছিল একটাই, এমন এক স্বাধীন, সার্বভৌম আর ইনসাফভিত্তিক আদর্শের বৈষম্যহীন শাসনকাঠামো খাড়া করা, যা সেই আমলের বুর্জোয়া রাজনীতির তোষামোদি আর আপসকামিতা থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এবং যুগান্তকারী। নজরুল নবযুগ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে লেখেন ‘নারী-পুরুষনির্বিশেষে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতাসূচক স্বরাজ্য লাভ।’ তথাপি অধিকাংশ সমালোচক আর জীবনীকাররা নজরুলকে স্রেফ রোমান্টিক বা ‘বিদ্রোহী কবি’র চিহ্নিত কইরা খালাস দিতে চান; কিন্তু তার বৈপ্লবিক লেখনীর অন্তরালে যে একটা স্পষ্ট ও তাত্ত্বিক পলিটিক্যাল দর্শন সক্রিয় আছিল, সেইটা তারা দেখতে পায় না। তার এই দর্শনের সেন্টার পয়েন্টে আছিল অবদমিত আর প্রান্তিক মেহনতি মানুষের মুক্তির ব্যাকরণ। বাংলার আধমরা আর পরাধীন জনসমষ্টির রাইটস রক্ষা করার যে জিম্মাদারি নজরুল নিজের স্কন্ধে তুইলা নিছিলেন, সেইটাই আছিল তার রাজনৈতিক চিন্তাধারা ও রাষ্ট্রভাবনার মূল চালিকাশক্তি। শৈশবে মক্তবের শিক্ষকতা, লেটো গানের দলে রামায়ণ-মহাভারতের দীক্ষা, আর পরে ১৯১৭-তে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়া করাচিতে থাকনের সময় কুরআনের তাফসীর, ওমর খৈয়াম আর রুমির সুফি সাহিত্যের লগে মোলাকাত। এইসব মিইলা তার দেখার দরজাটাকে বহুত্ববাদী ও তাত্ত্বিকভাবে সমৃদ্ধ কইরা তুলছিল।
তৎকালীন ভারতের মূলধারার পলিটিক্যাল লিডাররা যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ল্যাজ ধইরা সীমিত স্বায়ত্তশাসন বা ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস অর্জনের লাইগা আপসকামিতার রাস্তায় হাঁটতেছিল, নজরুল তখন পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে অনড়। ১৯২২ সালে তার সম্পাদিত অর্ধ-সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ধূমকেতু’র মারফতে তিনি সর্বপ্রথম দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ভারতের কমপ্লিট আজাদির দাবি উত্থাপন করলেন। ‘ধূমকেতুর পথ’ প্রবন্ধে নজরুল সাফ সাফ লিখছেন যে, ‘‘স্বরাজ-টরাজ বুঝি না, কেননা, ও-কথাটার মানে এক এক মহারথি এক এক রকম করে থাকেন। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশির অধীন থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা-রক্ষা, শাসনভার, সমস্ত থাকবে ভারতীয়ের হাতে। তাতে কোনো বিদেশির মোড়লি করবার অধিকারটুকু পর্যন্ত থাকবে না। যাঁরা এখন রাজা বা শাসক হয়ে এ-দেশে মোড়লি করে দেশকে শ্মশান-ভূমিতে পরিণত করছেন, তাঁদেরে পাততাড়ি গুটিয়ে, বোঁচকা-পুঁটলি বেঁধে সাগর-পারে পাড়ি দিতে হবে।’’ এই পলিটিক্যাল ভিউ কিন্তু এলিট লিডারদের নিয়মতান্ত্রিক আর কচ্ছপ-গতির আন্দোলনের বিপরীতে এক ক্ষুরধার ও বৈপ্লবিক রাজনৈতিক দর্শনের বড়সড় ধাক্কা আছিল। নজরুল বুঝছিলেন, ঔপনিবেশিক শাসনযন্ত্রকে আংশিক তোষামোদে খতম হইবো না, একে এক্কেবারে উপড়ায়া ফেলতে হইবো, তবেই জনগণের মুক্তি। তার এই আপসহীন রাষ্ট্রচিন্তা ব্রিটিশ রাজকে এতটাই খৌফ বা ভয়ের মধ্যে ফালায়া দিছিল যে, তারা কবির লেখনীকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার তকমা দিয়া তাকে জেলের ভাত খাওয়ায়। প্রেসিডেন্সি জেলে বইসা তিনি যখন ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ (১৯২৩) লেখেন, সেইটা স্রেফ আত্মপক্ষ সমর্থন আছিল না; ওইটা আছিল ঔপনিবেশিক জুডিশিয়াল সিস্টেম আর রাষ্ট্রীয় জুলুমের বিরুদ্ধে এক কালজয়ী রাজনৈতিক ইশতেহার। রাজবিচারের চেয়ে সত্য ও ন্যায়ের বিচারকে সবকিছুর উপরে স্থান দিছিলেন। নজরুলের এই সার্বভৌমত্বের ধারণাকে যদি প্রাচীন ভারতীয় পলিটিক্যাল চিন্তার আয়নায় দেখা যায়, তিনি তৎকালীন আমলের ঔপনিবেশিক শাসনকে এক জাতের আধুনিক ‘মাৎস্যন্যায়’ হিশাবে দেখছিলেন। যেখানে বড় মাছ ছোট মাছরে গিলে খায়, অর্থাৎ শক্তিশালী ব্রিটিশ শক্তি দুর্বল ভারতকে চিবায়া খাচ্ছিল। প্রাচীন নীতিশাস্ত্রের ‘দণ্ডনীতি’ বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়সঙ্গত বলপ্রয়োগের আইডিয়াটাকেই নজরুল তার বৈপ্লবিক কাব্যে আধুনিক রূপ দিছিলেন। যেটা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন, ‘‘তিনি রাসুলদের পাঠিয়েছেন কিতাব ও মীযান (ইনসাফের মানদণ্ড) দিয়ে, যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে। এর পাশাপাশি তিনি ‘লোহা’ (যা শক্তি ও বলপ্রয়োগের প্রতীক) নাযিল করেছেন, যাতে রয়েছে প্রবল শক্তি এবং মানুষের জন্য কল্যাণ।” এটা তার শুরুর দিককার গল্পগ্রন্থ ‘ব্যথার দান’-এ তিনি স্পষ্ট করছিলেন, “পরাধীন লোক যত কমে ততই মঙ্গল।” এই দৃষ্টিভঙ্গি থেইকা তার স্বাধীনতার অন্বেষণ আছিল মূলত ঔপনিবেশিক মাৎস্যন্যায় বিনাশ কইরা প্রজার কল্যাণমুখী সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্র কায়েম করা।
নজরুলের রাজনৈতিক দর্শন ও রাষ্ট্রভাবনার অর্থনৈতিক ভিত্তিভূমির একটা বড় অংশ আইছিল সমাজতন্ত্রের সাম্যবাদ ও ইসলামের ইনসাফ কায়েমের থেইকা উৎসারিত। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পর সোভিয়েত ইউনিয়নে মজদুর বা শ্রমিক শ্রেণির শাসন কায়েম হওয়ার পর দুনিয়াজুড়ে যে সমাজতান্ত্রিক চেতনার আলোড়ন সৃষ্টি হইছিল, তা নজরুলকে পুরাপুরি অনুপ্রাণিত কইরা তোলে। তিনি টের পাইছিলেন যে, ঔপনিবেশিক শাসন খতম হইলেই শোষণের অবসান না; উৎপাদনের উপকরণের মালিকানা যদি সেই মুষ্টিমেয় ধনিক আর বুর্জোয়াদের হাতেই থাইকা যায়, তবে তা খাঁটি আজাদি বা মুক্তি আনবে না। ফলে তার খিলাফত বা রাষ্ট্রচিন্তা স্রেফ ভৌগোলিক আজাদির সীমানায় আটকে ছিল না, এর আসল জিম্মাদারি আছিল অর্থনৈতিক শোষণের অবসান ঘটানো। এই অর্থনৈতিক মুক্তির টার্গেট নিয়াই কমরেড মুজাফফর আহমদের লগে হাত মিলায়া তিনি পলিটিক্যাল ময়দানে নামেন এবং ১৯২৫ সালে ‘শ্রমিক প্রজা স্বরাজ দল’ খাড়া করতে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। যা কংগ্রেসের অভ্যন্তরে থাইকা একটা রেভল্যুশনারি ফ্রন্ট হিশাবে কাম করতো। এই দলের মুখপত্র হিশাবে তার জিম্মাদারিতেই পয়লা ‘লাঙল’ আর পরে ‘গণবাণী’ পত্রিকা প্রকাশ হয়। ১৯২২ সালের দিকে তৎকালীন ভদ্রলোকি রাজনীতিতে যখন খেতমজুর আর চাষাভুষাদের কোনো দামই আছিল না। মুজাফফর আহমদের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী তখন নজরুল “আমূল পরিবর্তিত হইয়া সম্পূর্ণভাবে মেহনতি মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি লাল কালির কলম লিখতেন, লাল জামা গায়ে দিতেন, আর লাল নিশানের গান গাইয়া নিজের ভিতরে কমিউনিস্ট আগুন জ্বালাইয়া রাখতেন।” মেহনতি মানুষের স্বার্থ রক্ষার লাইগা নজরুলের পলিটিক্যাল পার্টি আর ‘লাঙল’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় সুনির্দিষ্ট সংস্কারমূলক দাবি তোলা হইছিল, যার একটা সুনির্দিষ্ট রূপরেখাও আছিল। সেখানে প্রজার দখলীয় জোত হস্তান্তর করার পূর্ণ অধিকার দেওয়া এবং জমিদারের পত্তনী নজরানা প্রথা বিলোপের দাবি। যা জমিদারের মধ্যস্বত্বভোগী একচেটিয়া আর্থিক শোষণ কমায়া কৃষকদের জমির প্রকৃত মালিকানা দিতে সক্ষম আছিল। একই লগে দখলীয় জমির গাছ কাটা, পুকুর কাটা আর দালান তোলার অধিকারের মাধ্যমে ভূমির ওপর প্রজাদের প্রথাগত স্বায়ত্তশাসন বা ট্র্যাডিশনাল স্ট্রাকচার নিশ্চিত করার প্রস্তাব করা হয়। জমিদারের একতরফা খাজনা বাড়ানো আর অতিরিক্ত বেআইনি চাঁদা বা আবওয়াব আদায় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করার দাবি, গ্রামীণ সামন্ততান্ত্রিক শোষণ আর অনিয়মতান্ত্রিক চাঁদাবাজির দফারফা কইরা কৃষকদের উচ্ছেদ আর করের বোঝা থেইকা বাঁচার এক অনন্য আইনি রূপরেখা তৈরি করছিল।
নজরুলের রাষ্ট্রচিন্তার অন্যতম মৌলিক স্তম্ভ নাম আছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আর এক বহুত্ববাদী সমাজকাঠামো প্রতিষ্ঠা করা। ১৯২৬ সালের হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার কালো অধ্যায়ের প্রেক্ষাপটে তিনি যখন ‘মন্দির ও মসজিদ’ প্রবন্ধ লেখেন, তখন সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ আর সংকীর্ণতার পিত্তি জ্বালাইয়া দিছিলেন। তিনি ধর্মের অপব্যবহারের ঘোর বিরোধী আছিলেন এবং প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের সৌন্দর্য না খুঁইজা তার থেইকা যারা ফায়দা লুটতো, সেই স্বার্থান্বেষী মোল্লা-পুরোহিতদের বিরুদ্ধে খাপ্পা ছিলেন। তার মতে, যারা ধর্মের নামে দাঙ্গা-হাঙ্গামা করে তারা আসলে ‘ধর্মমাতাল’, সত্যের নূর না বুইঝা শাস্ত্রের অন্ধকূপে হাবুডুবু খাচ্ছে। তিনি কইতেন, “মোরা একই বৃন্তে দুটী কুসুম হিন্দু-মুসলমান, মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।” নজরুলের এই সমন্বয়বাদী চেতনা কিন্তু কোনো কায়দাবাজি বা ওয়েস্টার্ন সেক্যুলারিজমের অন্ধ নকল আছিল না; এইটা আছিল ইসলামের ইনসাফ ভিত্তিক জীবন ব্যবস্থার এক ন্যাচারাল সিলসিলা। তিনি একাধারে ইসলামী গজল আর শ্যামাসংগীত রচনার মাধ্যমে দুই সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে এক সুতোয় গাইথাছিলেন। নজরুল বিশ্বাস করতেন, এক বৈষম্যহীন রাষ্ট্রে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টানের মধ্যে কোনো সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় ভেদাভেদ থাকবে না। তার ‘মৃত্যুক্ষুধা’(১৯৩০) উপন্যাসে কৃষ্ণনগরের চাঁদসড়কে মুসলমান আর ধর্মান্তরিত ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের যে পারস্পরিক মহব্বতের সহাবস্থানের চিত্র তিনি দেখাইছেন, তা আছিল তার পরিকল্পিত বহুত্ববাদী সমাজের বাস্তব প্রতিফলন। এই ব্যাপারে অনুপ্রেরণা নিছিল ইসলাম থেইকা। ইসলামে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করার কোনো সুযোগ নেই। আল কুরআনের সূরা আল বাকারাহ’র ২৫৬ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ বলছেন, “দ্বীনের (ধর্মের) ব্যাপারে কোনো জবরদস্তিমূলক বাধ্যবাধকতা নেই”। আর সূরা আল-মুমতাহিনাহ-এর ৮ নম্বর আয়াতে বলছেন, “দীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের স্বদেশ হতে বহিস্কৃত করেনি তাদের প্রতি মহানুভবতা প্রদর্শন ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। আল্লাহতো ন্যায়পরায়ণদেরকে ভালোবাসেন।” কুরআনের চিন্তাকে ধারণ করলেও তৎকালীন কমবুঝ রক্ষণশীল সমাজ যখন তাকে ভুল বুঝে ‘কাফের’ বা ‘নাস্তিক’ ফতোয়া দিয়া গালিগালাজ করছিল, তখন মওলানা আকরম খাঁর স্ত্রীর উদ্যোগে এক ঘরোয়া মজলিসে কবির মুখে হামদ-নাত আর ইসলামী সংগীত শুইনা উপস্থিত আলেম সমাজ অশ্রুসিক্ত হন এবং পরে জানতে পারছিল এই কালজয়ী ধর্মীয় বাণীগুলোর রচয়িতা আর কেউ নন, স্বয়ং কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তখন আলেম সমাজ সরমিন্দা হইছিলো, এইটা প্রমাণ করে, নজরুলের ধর্মভাবনা সংকীর্ণ আচারসর্বস্বতার ঊর্ধ্বে উইঠা ইনসাফ কায়েমের ইবাদতে লীন হইছিল।
নজরুলের রাজনৈতিক জীবন আর রাষ্ট্রভাবনার মূল্যায়নের ইতিহাসটা অত্যন্ত জটিল আর রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত। ব্রিটিশ আমল তো বটেই, পাকিস্তান আমলেও পূর্বপাকিস্তানে নজরুলের সামগ্রিকতাকে খণ্ডিত কইরা জাহির করছিলো। পাক শাসকরা চাইছিল নজরুলের বিপ্লবী সত্তাকে অবদমিত করতে। নজরুল ইসলামের সর্বজনীন চরিত্ররে ধামাচাপা দিয়া খন্ডিত লেখক সত্তাকে জোর কইরা বদলায়া দিতে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ও ভারতের বহু তাত্ত্বিক নজরুলের রাজনৈতিক সক্রিয়তাকে আড়াল কইরা তাকে স্রেফ এক ‘আবেগপ্রবণ ভাবুক’ বানানোর ধান্দায় আছিল। এই অপব্যাখ্যার মুখে ১৯৭০-এর দশকে শান্তা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নজরুল-একটি রাজনীতিক ব্যক্তিত্ব’ বইটা কবির রাজনৈতিক ভূমিকা মূল্যায়নের পয়লা আন্তরিক প্রয়াস হিশাবে সামনে আসে। এছাড়া ড. আবু হেনা আবদুল আউয়ালের ‘নজরুলের রাষ্ট্রচিন্তা ও রাজনীতি’ (১৯৯৯) বইটা নজরুলের রাষ্ট্রদর্শনকে একটা সুসংগঠিত পলিটিক্যাল ডিসকোর্স হিশাবে এস্টাবলিশ করতে সাহায্য করে। নজরুলের রাজনীতি স্রেফ ইমোশনের জোয়ার আছিল না, এইটা আছিল শোষিত জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আজাদির এক তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক নকশা।
নজরুলের সম্পাদিত প্রধান রাজনৈতিক মুখপত্র, প্রবন্ধ আর বাজেয়াপ্ত বইপত্রের ঐতিহাসিক ক্রোনোলজি বা টাইমলাইনটা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়। ১৯২২ সালে প্রকাশিত ‘যুগবাণী’ সাম্রাজ্যবাদ ও ব্রিটিশ শাসনের শৃঙ্খল ভাঙার উদাত্ত আহ্বান জানানোর কারণে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক রাজদ্রোহের অভিযোগে ৯৯এ ধারায় বাজেয়াপ্ত হয়। একই বছর ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার মাধ্যমে ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা এবং সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের দেশ ছাড়ার চরম হুঁশিয়ারি দিলে সম্পাদক নজরুলের কারাদণ্ড হয়। ১৯২৩ সালের ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ ছিল ঔপনিবেশিক বিচার ব্যবস্থার প্রহসনকে চ্যালেঞ্জ করে সত্য ও ন্যায়ের দার্শনিক বয়ান, যা আদালত প্রত্যাখ্যান করলেও রাজবন্দী হিসেবে কবির কারাদণ্ড বহাল রাখে। ১৯২৫ সালের ‘লাঙল’ এবং ১৯২৬ সালের ‘গণবাণী’ পত্রিকা যথাক্রমে কৃষক-মজুরের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শের প্রসারের মাধ্যমে বৈশ্বিক সর্বহারা বিপ্লবের সাথে সংহতি জ্ঞাপন করে, যা সামন্ততান্ত্রিক শক্তির কঠোর নজরদারি ও আর্থিক জরিমানার মুখোমুখি হয়। এছাড়া ১৯২৬ সালে প্রকাশিত ‘রুদ্র-মঙ্গল’ এবং ‘দুর্দিনের যাত্রী’ গ্রন্থ দুটি শোষক শ্রেণির বিনাশ এবং গণজাগরণের বৈপ্লবিক ইশতেহার হিসেবে প্রকাশের পরপরই ঔপনিবেশিক সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত ও নিষিদ্ধ ঘোষিত হইছিল।
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ‘রাষ্ট্র ও রবীন্দ্রনাথ’ আর ‘জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি’ বইগুলোর বয়ান থেইকা রবীন্দ্র আর নজরুলের রাষ্ট্রভাবনার মধ্যকার মৌলিক তফাত আর গভীর মিলের জায়গাটা স্পষ্ট হইয়া ওঠে। রবীন্দ্রনাথ ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময়ে জমিদারী টিকাইয়া রাখার খায়েশে একটিভ পলিটিক্সে নামলেন। এই প্রেক্ষাপটে তিনি লিখলেন ‘‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি। যহন বঙ্গভঙ্গ রদ হইয়া, বাংলাদেশীদের অধিকার খর্ব কইরা তাগো জমিদারী টিকা যায়, তখন রাজনীতি থেইকা সটকে পরে। কিন্তু তাগোর তৈরি করা এই সিলসিলায় স্বদেশী আন্দোলনের বর্ণহিন্দুরা উগ্রতা খুনাখুনি চালাইয়া যাইতে থাকে তখন ভদ্রলোকের মতো রুমালে মুখ লুকাইয়া রাজনীতি থেইকা সইটা পড়ে। স্বার্থ হাসিলে পর রবিঠাকুর ব্রিটিশ রাজকে খুশি করতে যান্ত্রিক জাতীয়তাবাদকে বিশ্বমানবতার দুশমন হিশাবে ক্রিটিক করছিলেন। যদিও তার ‘রক্তকরবী’, ‘তাসের দেশ’ আর ‘মুক্তধারা’ নাটকে স্বৈরাচারী কাঠামোর বিরুদ্ধে কিঞ্চিত পরিমাণ বাঁকা চিত্রায়ন করতে দেখা যায়। যদিও রাবীন্দ্রনাথ নিজেই সেই কাঠামোর একজন শোষক জমিদার ছিলেন। এর বিপরীতে নজরুলের বিদ্রোহ আছিল প্রকাশ্য, ওপেন আর রাজপথের লড়াইয়ের লগে সরাসরি সম্পৃক্ত। তিনি গান্ধীর অহিংসার প্রেসক্রিপশন এড়াইয়া ডিরেক্ট পূর্ণ আজাদির লাইগা যুবসমাজকে সশস্ত্র বিপ্লবের উদ্বুদ্ধ করাইতেছিলেন। নজরুলের এই সশস্ত্র বিপ্লবী মনোভাব মূলত তৈরি হইছিল এলিট কংগ্রেসী রাজনীতির ব্যর্থতার প্রতিক্রিয়ায়, কারণ কংগ্রেস সাধারণ মেহনতি মানুষের জানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে পারে নাই। শ্রমিক প্রজা স্বরাজ দলের ইশতেহার স্পষ্টভাবে তিনি জানিয়েছে, ‘‘গণ-আন্দোলনের চলমান শক্তির প্রয়োগ দ্বারাই নিরস্ত্র জাতির পক্ষে স্বাধীনতা লাভের একমাত্র উপায়...’’। অপরদিকে আধুনিক উত্তর-ঔপনিবেশিক আর মার্কসবাদী সমালোচক ড. সলিমুল্লাহ খান নজরুলের রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক অবদানকে একটা পুরা নতুন তাত্ত্বিক ডাইমেনশনে ব্যাখ্যা করছেন। তিনি নজরুলের ভাষাবোধ আর ব্যক্তিসত্তার বৈপ্লবিক ক্যারেক্টারকে জার্মান ফিলোসফার ওয়াল্টার বেজ্জামানিনের ‘অরা’ থিওরির আলোকে ব্যবচ্ছেদ করছেন। বেঞ্জামিনের মতে, আধুনিক পুঁজিবাদী ও যান্ত্রিক যুগে শিল্পের আসল ও খাঁটি মুহূর্ত বা নান্দনিক গভীরতা নষ্ট হইয়া যায়, যারে তিনি ‘অরা’-র বিলুপ্তি কইয়া অভিহিত করেছেন। সলিমুল্লাহ খান দেখাইছেন, নজরুল তার কাব্যে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সম্মিলন ঘটাইয়া শিল্পের সেই হারায়ে যাওয়া জাদুকরী মুহূর্ত বা ‘অরা’ পুনরায় প্রতিষ্ঠা করতে চাইছিলেন। খান আরও যুক্তি দেন, নজরুলের বিদ্রোহ কেবল ভাবালুতা আছিল না, এইটা আছিল পশ্চিমা পুঁজিবাদী আধুনিকতার ক্রাইসিস আর সাম্রাজ্যবাদী দস্যুতার বিরুদ্ধে এক লড়াকু উত্তর-ঔপনিবেশিক প্রতিরোধ। নজরুল যে ভাষার সৃষ্টি করছিল এবং যেভাবে পৌরাণিক সিম্বল আর ইসলামী ঐতিহ্যগুলাকে বৈপ্লবিক উদ্দেশ্যে কামে লাগাইছিলেন, তা পশ্চিমা লিবারেল হিউম্যানিজমের বাউন্ডারি ভাইঙা একটা টোটাল অপশ্চিমা ও লড়াকু প্রতিরোধ-নন্দনতত্ত্বের জন্ম দেয়। একই সাথে ইকবালের রাষ্ট্রচিন্তার সাথে মিল রাইখা উপমহাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর আকাঙ্খাকে জাগাইয়া তুলছে। তিনি কইছেন ‘‘ নাই তা-জ /তাই লা-জ?/ ওরে মুসলিম, খর্জুর-শিষে তোরা সাজ!/ করে তসলিম হর কুর্নিশে শোর আওয়াজ/ শোনকোন মুজ্দা সে উচ্চারে হেরা আজ/ ধরা-মাঝ।”
নজরুলের পরিকল্পিত রাষ্ট্রচিন্তায় প্রান্তিক আর মাইনোরিটি পাবলিকের রিপ্রেজেন্টেশনের যে তাগিদ আছিল, তা দক্ষিণ এশিয়ার আধুনিক রাষ্ট্রগঠনের তর্কের লগে গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। কোচবিহারের রাজবংশী আন্দোলন বা নিম্নবর্ণের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের লড়াইয়ের মতোই নজরুল মনে করতেন, ‘‘সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রে যদি ছোট ছোট ধর্মীয় বা সামাজিক সম্প্রদায়ের কণ্ঠস্বর সুরক্ষিত না থাকে, তবে তা এক নতুন স্বৈরাচারের জন্ম দেবে।” ব্রিটিশ খেদাইয়া পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর নতুন কিসিমের সমস্যা পয়দা হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের বেইনসাফির বিপরীতে বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নজরুলের কবিতা আর গান আবার জ্যান্ত হয়া ওঠে, আজাদির লড়াইয়ে প্রেরণার জোগাইতে থাকে। এইটা আজাদির ইতিহাস হইলো এ কারণে, রাষ্ট্র নিয়া নজরুলের তাত্ত্বিক খোয়াব আছিল, ইনসাফ ভিত্তিক শোষণহীন, সাম্যবাদী আর বহুত্ববাদী রাষ্ট্রের খোয়াব। তার রাষ্ট্র চিন্তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন আজও একটা অসমাপ্ত এজেন্ডা হিশাবে বাংলাদেশ ঝুইলা রইছে। তার কারণে একাত্তরে আজাদি পাইলেও আবারও ২৪ তরুণদের খুন দিতে হইছে। সেই আন্দোলনেও নজরুল ছিলো বেপকভাবে প্রাসঙ্গীক। এর মানে খাড়ায়, যেখানেই স্বাধীনতা পরাহত সেইখানেই নজরুল।
পরিশেষে কইতে পাড়ি কাজী নজরুল ইসলামের রাষ্ট্রচিন্তা স্রেফ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছিল না, এইটা আছিল একটা দীর্ঘমেয়াদী মানবিক মুক্তির রূপরেখা। তার বৈপ্লবিক সাম্যবাদ, ধর্মীয় সম্প্রীতির কোশেশ আর প্রান্তিক মানুষের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের যে খায়েশ, তা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়ও চরম প্রগতিশীল আর প্রাসঙ্গিক। নজরুলের বৈচিত্র্যময় তাত্ত্বিক রাষ্ট্রচিন্তা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের ফ্রেমে বন্দি না। আজকের আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলাতে যেখানেই বৈষম্য আর মানসিকউগ্রতা মাথা চড়া দিয়া ওঠে, সেখানেই নজরুলের ‘প্রত্যাখ্যানের নন্দনতত্ত্ব’ আর শোষণহীন রাষ্ট্রাদর্শ এক রুহানী তাজাল্লি হিশাবে পথ প্রদর্শন করে। তার প্রতিফলন দেখি, “মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত/ আমি সেই দিন হব শান্ত।/ যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না,/ অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না।”
কোন মন্তব্য নেই