Header Ads

Header ADS

বাংলাদেশের সাহিত্যে বাবাচরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক রূপ ।। আাফসার নিজাম

বাংলাদেশের সাহিত্যে বাবাচরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক রূপ
আাফসার নিজাম

বাংলা সাহিত্যের জমিনে বাবা একটি পারিবারিক পরিচয়ের প্রতীক নয়, উনি আসলে বাংলার জ্যান্ত ইতিহাস। গোটা সমাজ, তামাদ্দুন, ব্যক্তিমানসের গভীরতম স্তরের মনস্তত্ত্বের বাহক। বাংলা কথাসাহিত্যের অলিগলি ধইরা হাঁটতে হাঁটতে কত রকমের বাবার লগেই না আমাগো মোলাকাত হয়! কেউ ঘরের ভেতর মস্ত এক ছায়াদার বটগাছের মতো দাঁড়াইয়া আছেন, কেউ আবার অনুপস্থিত থেকাও গোটা কাহিনির উপরে নিজের অদৃশ্য ছাপ রাইখা গেছেন। কেউ কঠোর, কেউ সংবেদনশীল মমতাময়; কেউবা নিজের বুকের ভেতরের সব আরমান চাপা দিয়া নিঃশব্দে সংসারের বোঝা টানতেছেন।
আসলে বাংলাদেশের সমাজের বাবাদের কাহিনি বুঝতে হইলে খালি পরিবার দেইখা হইব না; দেখন লাগব এই মুলুকের রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং মানসিক রূপান্তরের ইতিহাস, সমাজ আর কালচারের লম্বা সফরনামা। এইখানে বাবা একদিকে যেমন ঐতিহ্য ও ধর্মীয় মূল্যবোধের ধারক, রেওয়াজ আর খানদানি তাহজীবের আমানতদার, তেমনি আধুনিকতার ঝড়ঝাপটায় আহত, দ্বিধাগ্রস্ত আর আত্মপরিচয়ের খোঁজে ঘুরপাক খাওয়া এক মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের বাহক।
বাংলা সাহিত্যের বাবা চরিত্র অসহায়ত্ব প্রায়ই নীরবতার আবরণে ঢাকা থাকে। তারা সাধারণত নিজেদের মহব্বত, মায়া কিংবা কষ্ট খুব একটা জাহির করেন না। বুকভরা ভালোবাসা থাকলেও মুখে তার তেমন প্রকাশ নাই। কিন্তু এই নীরবতা কোনো শূন্যতা ঠাওরান যাইব না; বরং এইডাই হইলো বাংলাদেশী সমাজের বহু পুরান এক মনস্তাত্ত্বিক ভাষা। বিশেষ কইরা গ্রামবাংলার সমাজে বাবার উপর ফরজ দায়িত্ব চাপানো হইতো। বালেগ হওয়ার পর থেকেইকায়া তারে শিখাইতো, পরিবারের রিজিকের বন্দোবস্ত করা, সামাজিক ইজ্জত-আবরু রক্ষার দায়িত্ব তার। এহেনাবস্থায় তার নিজের ব্যক্তিগত আবেগ চাপা রাখাটাই যেন এক অলিখিত রেওয়াজ আছিল। ফলে বাংলাদেশি সাহিত্যের পাতায় পাতায় দেখি এইসব নীরব বাবাদের পরিবার টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে নিয়োজিত থাকতে। সাহিত্যে এই নীরব ও আত্মসংযমী বাবা চরিত্র গভীর মানবিকতা ও বেদনাবোধের নিশান হইয়া খোদাই কারা থাকে আমাগো সাহিত্যে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে কিন্তু এই বাবাচরিত্রগুলারে বারবার নতুন সুরত দিছে। ইংরেজি ঔপনিবেশিকতা, কৃষক আন্দোলন, সাতচল্লিশের দেশস্বাধীন, ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান কিংবা একাত্তরের আজাদি, এইসব তুফান বাংলাদেশী সমাজের পারিবারিক কাঠামোডারে গভীরভাবে প্রভাবিত কইরা দিছে। এই পরিবর্তন সাহিত্যের বাবাচরিত্রে স্পষ্টভাবে দেখা যায়। 
জমিদারি আর সামন্তি সমাজের অবসান, নগরায়ন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, দারিদ্র্য, আধুনিক তালিমের প্রসার, সব মিলায়া বাবার সেই চিরচেনা কর্তৃত্বও আর আগের মতো অটুট থাকে নাই। ফলে বাংলা সাহিত্যের বাবারা কেবল হুকুমদাতা ক্ষমতার প্রতীক না; বরং তারা নিজেরাই অনেক সময় সংকটে জর্জরিত, দ্বিধাবিভক্ত আর আত্মপরিচয়ের সন্ধানী একেকজন মানুষ।
শওকত ওসমানের জননী উপন্যাসের আলী আজহার খাঁ চরিত্রডারে ধরেন। এই সংকটের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। লোকটা গরিব কৃষক, কিন্তু তার দিল-দিমাগের ভেতর এখনো পূর্বপুরুষের আভিজাত্যের স্মৃতি গভীরভাবে জিইয়া আছে। বাস্তবের অভাব-অনটন তার সবকিছু কেড়ে নিলেও তিনি মানসিকভাবে অতীতের নবাবি শান-শওকত ছাড়তে পারেন না। অতীতের এই মোহ তাকে বর্তমানের বাস্তব জীবন থেইকা বিচ্ছিন্ন কইরা দূরে সরাইয়া নেয়। সংসারের দায়িত্বও তাই ঠিকমতো পালন করা হয় না। তার মনের ভেতর অতীতের নস্টালজিয়া আর বর্তমানের দুঃসহ বাস্তবতার যে সংঘাত, সেইডা কেবল একজন মানুষের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হইয়াই ধরা দেয় না; ধরা দেয় বাংলাদেশের সামন্তি সমাজের অবক্ষয়ের এক জ্যান্ত আলামত হিশাবে।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামার তমিজের বাবা চরিত্রটিও বাংলা সাহিত্যের প্রান্তিক মানুষের স্বপ্ন, বঞ্চনা এবং অবচেতন মনস্তত্ত্বের এক অনন্য প্রকাশ। নামহীন এই চরিত্রটি সমাজের সেইসব মানুষের প্রতিনিধি, যাদের ব্যক্তিসত্তা সামাজিক কাঠামোর ভিতরে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় হারাইয়া ফেলে। বাস্তব জীবনের জুলুম, শোষণ আর বঞ্চনা থেইকা নাজাত পাইতে তিনি খোয়াব, অলৌকিক বিশ্বাস আর লোকঐতিহ্যের জগতে আশ্রয় খোঁজেন। তার মনোজগতে ধর্মী, কল্পনা, গ্রামীণ লৌকিকতা আর অবচেতন আকাঙ্ক্ষা মিলেমিশে এক আজব দুনিয়া বানায়। বাস্তবে ভূমিহীন আর নিপীড়িত এই মানুষ খোয়াবের ভিতর মুক্তির রাস্তা খুঁজতে থাকেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই খোয়াবই তার ট্র্যাজেডির কারণ হয়। লেখক এই চরিত্রের মাধ্যমে দেখাইছেন, সামাজিক শোষণ খালি পেটের উপরেই না, মানুষের মনের ভেতরেও গভীর জখম কইরা যায়।
আবার শাহেদ আলীর জিবরাইলের ডানা গল্পে বাবার অনুপস্থিতিই আসল কাহিনি। বাবাহীন শিশু নবী বড় হয় অভাব, ক্ষুধা আর অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়া। বাস্তবের জিন্দেগিতে কোনো অভিভাবক না পাইয়া সে কল্পনার জগতে এক ঐশ্বরিক আশ্রয় বানায়। জিবরাইলের প্রতি তার বিশ্বাস আসলে হারানো বাবারই এক মানসিক প্রতিস্থাপন। শিশুমনের এই প্রতিরক্ষা কৌশল মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত তাৎপর্য বহন করে। কারণ বাবার অনুপস্থিতি অনেক সময় মানুষরে ধর্মীয় বিশ্বাসকে আকরে ধরে কিংবা কল্পনাপ্রসূত আশ্রয়ের দিকে ঠেইলা দেয়। কিন্তু যখন নবী বাস্তবতার নির্মম চেহারার মুখোমুখি হয়, তখন তার সেই বিশ্বাস ভাঙয়া চুরমার। এই স্বপ্নভঙ্গ খালি এক শিশুর না; বরং সমাজের বঞ্চিত মানুষের সম্মিলিত স্বপ্ন হারানোর প্রতীক হিশাবে হাজির হয়।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর কাঁদো নদী কাঁদো উপন্যাসের মুহাম্মদ মুস্তফা চরিত্রডার ভেতর আবার বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজের অবদমিত মানসিকতার এক গভীর প্রতিফলন দেখা যায়। সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক দায়দায়িত্ব আর ব্যক্তিগত অপরাধবোধের চাপ তার ব্যক্তিসত্তারে ধীরে ধীরে ক্ষয় কইরা ফেলে। এহেনকালে সে নিজের অনুভূতিগুলো প্রকাশ করতে পারে না; বরং সেগুলোকে দমন কইরা রাখে।। ফলে সবকিছু বুকের ভেতর জমতে জমতে একসময় মানসিক সংকটে রূপ নেয়। তার অন্তরের কান্না নদীর কান্নার লগেই একাকার হইয়া যায়। লেখক দেখাইছেন, সমাজের চাপাইয়া দেওয়া নীরবতা অনেক সময় মানুষের মানসিক ভারসাম্য পর্যন্ত নষ্ট কইরা দিতে পারে।
আল মাহমুদের অনেক লেখায় বাবাকে দেখা গেছে এক কঠোর এবং গম্ভীর ব্যক্তিত্ব হিশাবে। গ্রামীণ মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে বাবার যে ভাবগাম্ভির্য থাকতে দেখি, সেই প্রতিফলন তার লেখায় ফকফকা হইয়া ধরা দেয়। সেইখানে ভয়ের চেয়ে এক ধরণের শ্রদ্ধা মিশ্রিত দূরত্ব বেশি কাজ করে। তার উপন্যাস, কবিতা আর আত্মজৈবনিক রচনায় তিনি গ্রামবাংলার সেই কঠোর বাবার আদল ফুটাইয়া তুলেছেন, যেইহানে সন্তান বাবার সামনে দাঁড়ালে এক ধরণের জড়তা অনুভব করে। তার উপন্যাসগুলাইতে প্রায়ই বাবার কঠোর শাসন এবং সাংসারিক শৃঙ্খলা রক্ষার চিত্র পাওয়া যায়, যেখানে বাবা সন্তানের সাথে সরাসরি আবেগ প্রকাশ না কেইরা দূর থেইকা শাসন করেন। উপমহাদেশ বা কাবিলের বোন-এর মতো গদ্যগুলোতে পারিবারিক সম্পর্কের যে বয়ান পাওয়া যায়, সেখানে পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর কেন্দ্রে বাবা চরিত্রটি এক অটল ও ধ্রুব শক্তির মতো খাড়াইয়া থাকতে দেখি। 
সময় বদলাইছে, আর সেই লগে বদলাইছে বাংলা সাহিত্যের বাবাদের সুরতও। একসময় বাবা আছিলেন দূরবর্তী, কঠোর আর কর্তৃত্বপরায়ণ এক ব্যক্তিত্ব। সংসারের ফয়সালা তার মুখ থেইকাই বের হইতো, আর সেই সিদ্ধান্তই আছিল চূড়ান্ত হুকুম। কিন্তু আধুনিক সাহিত্যে বাবা ক্রমশ আরও মানবিক, সংবেদনশীল আর আত্মসমালোচনাপ্রবণ হইয়া উঠছেন। হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যে এই বদল স্পষ্ট দেখা যায়। তার উপন্যাসের বাবারা সাধারণত মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। সীমিত সামর্থ্যের ভেতরও তারা সন্তানদের জন্য বুকভরা ভালোবাসা বহন করেন। তারা শাসনের বদলে বোঝাপড়া মাধ্যমে সম্পর্ক গইড়া তোলতে চেষ্টা করেন। তবে হুমায়ূন আহমেদের হিমুর বাবার মতো চরিত্র আবার এই কথাও মনে করাইয়া দেয় যে, অতিরিক্ত আদর্শবাদ কিংবা সন্তানের উপর নিজের স্বপ্ন চাপাইয়া দেওয়ার প্রবণতা সবসময় কল্যাণকর না হইয়া  সন্তানের স্বাভাবিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর হইতে পারে।
আসাদ চৌধুরীর কবিতায় বাবা আরও এক ধাপ সর্বজনীন রূপ লাভ করেন। এইখানে তিনি কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি কিংবা সামাজিক অবস্থানের প্রতিনিধি না; বরং মানবতার এক প্রতীক। তিনি মানুষের লগে মানুষের সম্পর্কের কথা কন, সন্তানরে মানবিক মূল্যবোধের তালিম দেন। এই ধরনের বাবাচরিত্র বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক চেতনারও প্রতিফলন।
সমকালীন বাংলা সাহিত্যে আবার আরেক ধরনের বাবার চরিত্র দেখা যায়। এই চরিত্রগুলো একদিকে দ্বীনি মূল্যবোধ আঁকড়াইয়া ধরতে চায়, অন্যদিকে আধুনিক জীবনের বাস্তবতাকেও অস্বীকার করে না। তারা সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা দিতে আগ্রহী, কিন্তু একইসঙ্গে বদলাইয়া যাওয়া সমাজের বাস্তবতা বুঝারও চেষ্টা করে। ফলে তাদের মনোজগতে ঐতিহ্য আর আধুনিকতার একটি দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক গইড়া ওঠে। এই সিলসিলার লেখকরা হইলেন, সোলায়মান আহসান, জামেদ আলী, মোহাম্মদ লিয়াকত আলী, আহসানুল ইসলাম বাবুল, নাজিব ওয়াদুদ, বুলবুল সরওয়ার প্রমূখ।
বাংলাদেশের সিনেমাতেও বাবা চরিত্রের হাজিরা কম না। বিশেষ কইরা স্বাধীনতার পর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলায় বাবারে জাতীয় পরিচয়, ধর্মীয় বিশ্বাস আর আধুনিকতার টানাপোড়েনের ভেতর দিয়া দেখানো হইছে। এইসব চরিত্র প্রায়ই আত্মপরিচয়ের সংকটে ভোগে। তারা একদিকে রেওয়াজ আর ঐতিহ্য বাঁচাইয়া রাখতে চায়, অন্যদিকে নতুন সময়ের লগেও তাল মিলাইতে চায়। এই দ্বন্দ্বই তাদের আরও জটিল, আরও বাস্তব কইরা তোলে।
সবশেষে এই কথাডা নির্দ্বিধায় কওয়া যায়, বাংলাদেশের সাহিত্যে বাবাচরিত্র খালি পারিবারিক সম্পর্কের বয়ান না; এইডা আসলে এক জাতির সমাজ-মনস্তত্ত্বের দলিল। এইসব চরিত্রের ভিতর দিয়া আমরা ইতিহাস, অর্থনীতি, ধর্ম, সংস্কৃতি আর ব্যক্তিমানসের বহুমাত্রিক সম্পর্কের সন্ধান পাই। সামন্তি সমাজের অবক্ষয়, প্রান্তিক মানুষের খোয়াব, মধ্যবিত্তের নীরব বেদনা, বাবার অনুপস্থিতির শূন্যতা কিংবা আধুনিকতার সংকট, সব মিলায়া বাবাচরিত্র বাংলা সাহিত্যে এক গভীর, বহুমাত্রিক আর তাৎপর্যপূর্ণ মাকাম দখল কইরা আছে। সময়ের লগে লগে এই বাবাসত্তার রূপ যেমন বদলাইতেছে, তেমনি বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারও নতুন নতুন সৃজনশীলতায় সমৃদ্ধ হইতেছে। আর এই সফর যে এখানেই থামতেছে না, সেইডা বলার অপেক্ষা রাখে না।

#মূলধারা
#আফসার_নিজাম
#afsar_nizam
#আফসারনিজাম
#afsarnizam
#সাহিত্য
#বাংলাসাহিত্য
#প্রবন্ধ
@followers





কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.