ছোট কাগজ মন যোগায় না, মন জাগায় ।। আফসার নিজাম
আফসার নিজাম
ছোট কাগজ করতে গিয়ে আমাদের কতটা ছোট হতে হয়, না কতটা বড় হতে হয়—তা আজ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছোট কাগজের জন্ম দিতে আমাদের ছোট প্রাণের যে সামান্য সম্বল থাকে, তাকে দিতে হয় কোরবানি। ছোট প্রাণ বলছি এ কারণে যে, এই ছোট কাগজের জন্মদাতা তরুণ; সমাজের আট-দশটা জীবনের তুলনায় তার বয়সের ব্যাপ্তি কম। যদিও চিন্তার ব্যাপ্তি আশি বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তির চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়।
কেন তরুণরা এই ছোট কাগজের মধ্যে আত্মনিয়োগ করে? কারণ, প্রচলিত সমাজের যে চিন্তা-চেতনা, তাকে সে চ্যালেঞ্জ করে এবং বলে-আমি এক নতুন তরিকার প্রবর্তক। আমার এই তরিকায় আছে সমাজের সমূহ কল্যাণ। আমার এই তরিকায় আছে শিল্প-সংস্কৃতির নতুন বয়ান। সেই বয়ান জনমানুষের কাছে তুলে ধরতেই তাদের কোরবানি।
ছোট কাগজ যে গন্ধ, বর্ণ এবং ধর্ম নিয়ে জন্মলাভ করেছে, তার একটি প্রাক্-বয়ান হলো- প্রচলিত শিল্পে আত্মনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠিত শিল্পীরা নিজেদের প্রভু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সেই প্রভুত্বকে অস্বীকার করে ছোট কাগজ। তাদের প্রভুত্বকারী যে চিন্তা, সেই চিন্তাকে তারা বাতিল ঘোষণা করে। তারা বলতে চায়—আমরা আপনাদের চিন্তাকে সম্মান করি, কিন্তু আপনাদের চিন্তায় আমরা আস্থা প্রকাশ করছি না। আমরা শিল্পে আনতে চাই নতুন চিন্তাশৈলী; যে চিন্তা সমকালীন শিল্পে প্রভাব বিস্তার করবে।
সমকালীন মানে আমাদের সময়। আমাদের সময় মানে এই চলমান প্রক্রিয়া। এই চলমান প্রক্রিয়ায় আপনারা শিল্পকে যে চোখে দেখেন, আমরা সে চোখে দেখি না। আপনারা যেভাবে গন্ধ অনুভব করেন, আমরা সেভাবে গন্ধ অনুভব করি না। আপনারা যে বর্ণ ধারণ করেছেন, আমরা সে বর্ণ ধারণ করি না। আপনারা যেভাবে জীবন ধারণ করেন, আমরা সেভাবে জীবন ধারণ করি না। এভাবেই আমরা প্রতিনিয়ত প্রবীণদের জীবন ও তাঁদের চিন্তাধারা থেকে নিজেদের আলাদা করে তুলি।
কতগুলো বিষয়ের ওপর ছোট কাগজ নিজেদের দৃঢ়পায়ে দাঁড় করিয়ে রাখে-
১. জীবনের গভীর লক্ষ্যকে সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করা।
২. ঐতিহ্য ও সমাজসচেতন, প্রবল নৈতিক শক্তিসম্পন্ন চেতনাকে ক্রিয়াশীল রাখা।
৩. মিডিয়াকেন্দ্রিক জীবন থেকে আত্মকেন্দ্রিক জীবনে রূপান্তরের প্রেরণা দেওয়া।
৪. মননশীলতায় ঋদ্ধ হওয়া এবং নতুনত্ব ও নিরীক্ষায় সর্বদা নিয়োজিত থাকা।
৫. সাহিত্য-সংস্কৃতির স্বঘোষিত কেয়ারটেকারদের চ্যালেঞ্জ করা।
৬. স্বনির্বাচিত সত্যিকার দায়বদ্ধতায় বিশ্বাসী থাকা।
৭. তারুণ্যের অভিযাত্রাকে শক্তিশালী ও গতিশীল করে তোলা।
ছোট কাগজের আর-একটি দিক হলো সমমনা শিল্পী ও সাহিত্যসেবীদের একটি সংগঠন। এই সংগঠন ক্রমাগত নিজেদের প্রস্তুত করে নতুন একটি আন্দোলনের জন্য। মূলত এই আন্দোলনই ছোট কাগজের আন্দোলন বা লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন নামে পরিচিত।
এই আন্দোলনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো প্রথাগত চিন্তার বাইরে নতুন চিন্তাকে প্রতিষ্ঠিত করা। নতুন বয়ানের প্রস্তুতির জন্য আড্ডা, নিজেদের বয়ানকে সমৃদ্ধ করা, নতুন বয়ানধারীদের সংগ্রহ করে নিজেদের দলকে শক্তিশালী করা এবং এই আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশকারী পাঠকদের সঙ্গে একটি মেলবন্ধন গড়ে তোলা—এসবই এর গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এরপর সেই বয়ানগুলোকে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়।
বাংলাদেশে এই আন্দোলন শুধু কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে সাহিত্যপত্র যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ফটোগ্রাফি, চিত্রকলা, নির্মাণশিল্প ও চলচ্চিত্রও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ছোট কাগজ আন্দোলনের একটি অনন্য মাধ্যম। এসব কাজ সাধারণত আন্দোলনকারীদের নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত হয়, যেখানে ব্যবসায়িক মুনাফার কোনো সুযোগ থাকে না।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, ছোট কাগজ আন্দোলনে দশকভিত্তিক হিসাব থাকলেও সবাই সংঘবদ্ধভাবে আন্দোলন করে না। এর মধ্যে ছোট ছোট গোষ্ঠী আলাদাভাবে নিজেদের মতো করে আন্দোলন চালিয়ে যায়। যেখানে এক আন্দোলনকারীর সঙ্গে আরেক আন্দোলনকারীর মতের মিল নাও থাকতে পারে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের বয়ান একটিই- শিল্পকে নতুনের মধ্যে নতুনভাবে উপস্থাপন করা।
ছোট কাগজ মানুষের মননে নতুন চিন্তার খোরাক তৈরি করে এবং ক্রমাগত মননজগতে নতুন পথের সৃষ্টি করে। তাই ছোট কাগজ মন যোগায় না, মন জাগায়। বড় কাগজ বা প্রতিষ্ঠান মানুষের মন যোগানোর জন্য প্রতিনিয়ত কাজ করে যায়; কারণ মানুষের মন যোগিয়েই তাদের রুটি-রুজির ব্যবস্থা করতে হয়। এর কোনো ইতিবাচক প্রভাব সমাজে পড়ে না; বরং সমাজের বিদ্যমান বিরূপ প্রভাবই বড় কাগজ বা প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রতিফলিত হয়।
পক্ষান্তরে, ছোট কাগজ মানুষের মন জাগানোর চেষ্টা করে। কাজী নজরুল ইসলাম যেমন বলেছেন- “তোমার ছেলে জাগলে মাগো, রাত পোহাবে তবে।” এই ‘ছেলে’ই হলো ছোট কাগজ। সে নিজে জাগে এবং মানুষের মনকে সর্বদা জাগিয়ে রাখার কাজও করে।
দোহাই
১. লিটল ম্যাগাজিন: এক প্রতিষ্ঠানবিরোধী প্রতিষ্ঠান :: কামাল মোস্তফা
২. লিটল ম্যাগাজিনের চরিত্র-সন্ধানে :: সরকার আশরাফ
৩. ছোট কাগজ/বড় কাগজ: বৈপরীত্য ও সৃষ্টির প্রকাশ :: মঈন চৌধুরী
৪. প্রাঙ্গণ :: নাঈম মাহমুদ (সম্পাদিত)
৫. বিপরীত উচ্চারণ :: নাঈম মাহমুদ (সম্পাদিত)
৬. স্বল্পদৈর্ঘ্য :: সাজ্জাদ বিপ্লব (সম্পাদিত)
৭. ভনে :: সরসিজ আলীম (সম্পাদিত)
৮. নন্দন :: নাজিব ওয়াদুদ (সম্পাদিত)
৯. দৈনিক ইত্তেফাক
১০. পুষ্পকরথ :: হাফিজ রশিদ খান (সম্পাদিত)
১১. ময়মনসিংহ জংশন :: সরকার আজিজ (সম্পাদিত)
১২. শব্দগুচ্ছ :: হাসান আল আব্দুল্লাহ (সম্পাদিত)
১৩. দৈনিক সংগ্রাম
কোন মন্তব্য নেই