আল মাহমুদের ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ কবিতায় জাতিসত্তার আত্মপরিচয় ।। আফসার নিজাম
আল মাহমুদের ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ কবিতায় জাতিসত্তার আত্মপরিচয়
আফসার নিজাম
বাংলা কবিতা এবং আল মাহমুদের ঐতিহ্যচেতনা
ঔপনিবেশিক শাসনের সময়ে বাংলা কবিতার ধারায় যখন আধুনিক কবিতার সর্বগ্রাসী উলম্ফন, তখন আল মাহমুদ আধুনিক কবিতার নাগরিক আবহের মধ্যে গ্রামীণ লোকজ উপাদান এবং মুসলিম ঐতিহ্যকে এক অনন্য শৈল্পিক সুষমায় গেঁথে নির্মাণ করেছেন নতুন সড়ক। তাঁর কবিতা নির্মাণের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বাংলাদেশের গভীর অস্তিত্বের অনুসন্ধান, যা ঐতিহ্যের শিকড়কে স্পর্শ করে পূর্ণতা পায়। আল মাহমুদের কাছে ঐতিহ্য কেবল ইতিহাস নয়, বরং তা ছিল বর্তমানের সংকট মোকাবিলায় এক শক্তিশালী হাতিয়ার এবং ভবিষ্যতের পথনির্দেশক। সেই চিন্তার সিলসিলায় তিনি নির্মাণ করেন ঐতিহাসিক কবিতা ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’। কবিতাটি কেবল একটি ঐতিহাসিক বীরত্বগাঁথা নয়, বরং এটি বাংলাদেশিদের আত্মপরিচয় এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক শক্তিশালী কাব্যিক ইশতেহার। ঐতিহ্যের এই অনুসন্ধান প্রক্রিয়াটি আল মাহমুদের কবিতায় সময়ের সাথে সাথে প্রকট হয়ে উঠেছে। কবিতা লেখার শুরুর দিকে পঞ্চাশের দশকে কবি আধুনিকতার মিশেলে গ্রামীণ জীবনবোধ এবং প্রকৃতির রূপকার ছিলেন, কিন্তু সত্তর ও আশির দশকে তাঁর কবিতায় এক নতুন বাঁক লক্ষ করা যায়। এ সময় তিনি বাঙালি কৌম জীবনের অনার্য কল্লোল আর শোষিত মানুষের দ্রোহের পরিমাণ কমিয়ে দিয়ে প্রবলভাবে ইসলামি ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে যুক্ত করেন। ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ কবিতায় এই সিলসিলা অত্যন্ত স্পষ্ট, যেখানে কবি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজিকে বাংলার মানুষের মুক্তির দূত এবং শোষিত মানুষের জাগরণের প্রতীক হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন।
‘সোনালী কাবিন’ থেকে ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’
আল মাহমুদের সাহিত্যিক জীবনের প্রথম পর্বে ‘লোক লোকান্তর’ এবং ‘কালের কলস’ কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে তিনি গ্রামের জনজীবন এবং আধুনিক জীবনযন্ত্রণার মিশেলে এক চমৎকার চিত্রলিপি তৈরি করেছিলেন। তবে ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত ‘সোনালী কাবিন’ মাহমুদকে পৌঁছে দেয় বাংলা কবিতার শিখরে। এই বইয়ে তিনি গ্রামীণ জীবন, শহুরে বেদনা, লৌকিক সংস্কার এবং আদিমসম্পর্ক, কুরআনিক ভাষাশৈলীকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন, যা ছিলো তৎকালীন আধুনিক কবিতার ফেরিওয়ালাদের বিপরীতে এক বাংলাদেশি ভাষার বিদ্রোহ। সেই সময়ে তাঁর কবিতাকে বামপন্থীরা নিজেদের চিন্তাধারার ধারাবাহিকতা বলে প্রতীয়মান করলেও তারা কবিতার মূল সুর বুঝতে অপারগ হয়। তারা মাহমুদের কবিতায় গ্রামীণতা চিহ্নিত করেছে, অথচ গ্রামের মানুষের সংস্কৃতিকে এবং প্রাকৃত জীবনবোধকে খেয়াল করতে ব্যর্থ হয়। তবে ১৯৭৪ সালে রক্ষীবাহিনী কর্তৃক নির্যাতন ও কারাবরণ এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় কবির জীবনদর্শনে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়। জেলখানায় থাকাকালীন মাহমুদ ধর্মগ্রন্থসমূহের একটি তুলনামূলক পাঠের সুযোগ পান, যার কারণে তাঁর আত্মপরিচয়ের পুনর্জাগরণ হয়। আত্মপরিচয় ফিরে পাওয়ার আশির দশকে তাঁর কবিতায় ‘বাংলাদেশি’ পরিচয়টি প্রধান হয়ে ওঠে। ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ এবং ‘অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না’ এই বইগুলোকে আত্মপরিচয়ের সন্ধিক্ষণ হিসেবে ধরা যায়। এই ধারারই পূর্ণাঙ্গ এবং শক্তিশালী প্রকাশ ঘটে ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ কিতাবে, যেখানে কবি তাঁর পূর্বের লোকায়ত বাংলার সত্তাকে মুসলিম ঐতিহ্যের মরমী সত্তার সাথে সমন্বিত করেন।
কাব্যগ্রন্থসমূহের থিম্যাটিক বিবর্তন
‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ কবিতায় মুসলিম ইতিহাস, বিজয়গাঁথা, জাতিসত্তা নির্মাণ, ইতিহাসাশ্রয়ী মুসলিম ঐতিহ্য এবং ইতিহাসের কাব্যিক রূপান্তর পরিলক্ষিত হয়। কবিতাটি বাংলার ইতিহাস থেকে সংগৃহীত অনন্য আখ্যানধর্মী কবিতা, যা শুরু হয় এক বালকের জিজ্ঞাসার মধ্য দিয়ে। বালকটি তার মায়ের কাছে বখতিয়ার খলজির বীরত্বের কাহিনী শোনার জন্য ব্যাকুল। সে শুনতে চায় পূর্বপুরুষের বিজয়ের ইতিহাস। মা তাকে কবিতা শোনান: “বালিশে মাথা রাখো তো বেটা। শোনো বখতিয়ারের ঘোড়া আসছে। আসছে আমাদের সতেরো সোয়ারি হাতে নাঙ্গা তলোয়ার”। এই পংক্তিগুলোতে কবি লোকজ ছড়ার আঙ্গিকে একটি ঐতিহাসিক সত্যকে প্রবেশ করিয়েছেন। ঐতিহাসিকভাবে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি ছিলেন একজন তুর্কি সেনাপতি, যিনি অতি দ্রুতগতির অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে ১২০৩ বা ১২০৪ সালে বাংলার সেন বংশের রাজা লক্ষ্মণ সেনকে পরাজিত করে গৌড় জয় করেন। ইতিহাসবিদদের মতে, বখতিয়ারের আগমনের সময় তাঁর সাথে মাত্র ১৭ জন সৈন্য ছিলো, কারণ মূল বাহিনী তাঁর দ্রুতগতির সাথে তাল মেলাতে পারেনি। আল মাহমুদ এই ‘১৭ সোয়ারি’র কিংবদন্তিকে বাঙালি ও মুসলমানের যৌথ স্মৃতির অংশ হিসেবে কবিতায় ব্যবহার করেছেন।
ইতিহাস ও কবিতার মধ্যকার মিথষ্ক্রিয়া
আল মাহমুদ ইতিহাসের তথ্যকে হুবহু উপস্থাপন না করে সেটিকে কাব্যিক সৃজনশীলতার স্তরে উন্নীত করেছেন। ঐতিহাসিকভাবে বখতিয়ারের দৈহিক গঠন ছিলো খাটো এবং তাঁর হাত ছিলো অস্বাভাবিক লম্বা, যা তাঁর সময়ের জন্য প্রতিকূল বলে বিবেচিত হয়েছিলো। কিন্তু কবি তাঁর কবিতায় বখতিয়ারকে উপস্থাপন করেছেন ‘আল্লাহর সেপাই’ এবং ‘দুঃখীদের রাজা’ হিসেবে। এখানে বখতিয়ার কেবল একজন বিজেতা নন, বরং তিনি একাধারে আধ্যাত্মিক ও সামাজিক মুক্তির দিশারি। ইতিহাসবিদদের মতে, লক্ষণ সেন ছিলেন খুব অত্যাচারী শাসক। ভিন্ন ধর্মের মানুষের ওপর ছিলো তাঁর প্রচণ্ড ক্ষোভ। বিশেষ করে বৌদ্ধ ধর্মের মানুষদের তিনি বাংলা ছাড়া করেছিলেন। বাংলা ভাষাকেও তিনি ঘৃণা করতেন। বাংলা ভাষার কবিরা তখন দেশান্তরিত হয়ে আশ্রয় নেন নেপালে, সেখানে পাহাড়ে পাহাড়ে তারা বাস করতেন। বাংলা ভাষার প্রথম কাব্যগ্রন্থ চর্যাপদগুলো পরবর্তীতে এখানেই পাওয়া যায়। আল মাহমুদের বখতিয়ারের ঘোড়া কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পংক্তি হলো: “যেখানে আজান দিতে ভয় পান মোমেনেরা, আর মানুষ করে মানুষের পূজা, সেখানেই আসেন তিনি”। এটি তৎকালীন বাংলার ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসন এবং সামাজিক বৈষম্যের প্রতি কবির এক তীব্র ইঙ্গিত। ঐ সময় ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসনের জাতিভেদ প্রথা, উচ্চবর্ণের আধিপত্য এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি দীর্ঘকালীন সংগ্রাম ছিলো। হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদীদের অত্যাচার থেকে নাজাত পেতে ব্যাকুল ছিলো জনগণ। বখতিয়ার খলজি যখন বাংলায় প্রবেশ করেন তখন এদেশের শোষিত জনগণ তাঁকে বরণ করে নেয়। তাই বখতিয়ারের বিজয়কে মাহমুদ কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন হিসেবে দেখেননি, বরং একে দেখেছেন একটি জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় স্বাধীনতা অর্জন, মানবিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার এবং মুক্তির পথ হিসেবে।
মুসলিম ইতিহাস ও বাঙালি সংহতি
আল মাহমুদকে অনেকেই বাম ঘরানার নাস্তিক বা কমিউনিস্ট চিন্তার বলে ভুল বয়ান হাজির করেন। কারণ তিনি কাব্যে লোকজ অনুষঙ্গ ও সমতার কথা বয়ান করেছেন। বামেরা যেহেতু সাম্যবাদের কথা বলে, আল মাহমুদও সাম্যবাদের কথা বলেন। তাই তারা ধরে নিয়েছে মাহমুদ বাম চিন্তার কবি। আদতে তিনি বাম চিন্তার বাইরে দেশীয় চিন্তার মানুষ হিশেবেই প্রতিয়মান। কার্যত আমরা দেখতে পাই মাহমুদের কবিতায় ঐতিহ্য সন্ধান মূলত তাঁর আত্মঅনুসন্ধানেরই অংশ। তিনি বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশিদের নিজস্ব একটি ইতিহাস ও ঐতিহ্য আছে যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে এবং একটি দৃঢ় সংহতি প্রদান করে। বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয় এই সংহতি ও ঐতিহ্যের একটি কেন্দ্রীয় স্তম্ভ। বাংলা ভাষা সাহিত্য ও সৃজনশীলতা প্রাণ ফিরে পেয়েছে। দীনেশ চন্দ্র সেন এবং অন্যান্য গবেষকদের গবেষণায় দেখা যায়, হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদী সেন শাসনের ফলে বাংলা নিষ্পেষণের শিকার হয়, উচ্চবর্ণদের হাত থেকে প্রাকৃতজনের কথার মধ্য দিয়ে তা বেঁচে থাকে। পক্ষান্তরে মুসলিম বিজয়ের ফলে বাংলা ভাষা উচ্চতর সাহিত্যের স্তরে উন্নীত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। মুসলিম সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায় এ ভাষায় নতুন করে মহাকাব্য ও ধর্মীয় সাহিত্য রচিত হতে শুরু করে। মাহমুদ তাঁর কবিতায় বখতিয়ারকে তাই বাংলা ভাষিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণের আদিপুরুষ হিসেবে কল্পনা করেছেন। ‘তুলোর ভেতর অশ্বখুরের শব্দে স্বপ্ন তার নিশেন ওড়ায়।’ কবির দৃষ্টিতে বখতিয়ারের ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দই ছিলো বাংলার অন্ধকার যুগের অবসানের ঘোষণা।
‘ঘোড়া’ এবং ‘তরবারি’র প্রতীক ও রূপক
‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ কবিতায় ‘ঘোড়া’ শব্দটি বখতিয়ার খলজির বীরত্ব, গতি এবং সামাজিক পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে চিত্রায়িত হয়েছে। আল মাহমুদ লিখেছেন, “বাইরে তার ঘোড়া অস্থির, বাতাসে কেশর কাঁপছে। আর সময়ের গতির ওপর লাফিয়ে উঠেছে সে”। এখানে ঘোড়া কেবল একটি প্রাণী নয়, বরং এটি সময়ের পরিবর্তনের গতিকে নির্দেশ করে। যে গতিকে নিজের করে নিতে পারে সেই বিজয়ী বীর। বখতিয়ারের গতিকে তাই কবি তাঁর কবিতার নান্দনিকতায় বীরগাঁথায় রূপান্তর করেছেন। বখতিয়ারের ঘোড়াকে যেমন রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন, তেমনি তলোয়ারকে কবি বর্ণনা করেছেন ‘নাঙ্গা তলোয়ার’ হিসেবে, যা জালিম শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক। দ্রুত ও ক্ষিপ্রতার মাধ্যমে জালেম শাসনের অবসান কল্পে এটি ব্যবহার হয়। তবে এই বীরত্বের বয়ান নিয়ে সমালোচকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। আলতাফ পারভেজের মতো গবেষকরা মনে করেন, ‘কবি বখতিয়ারকে মহিমান্বিত করার মাধ্যমে বঙ্গে ইসলাম প্রচারে তাঁর অবদানকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়েছেন, যা হয়তো ঐতিহাসিক বাস্তবতার সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বাংলায় ইসলামের প্রসার মূলত তরবারির জোরে নয়, বরং সুফি-সাধকদের মানবিক ও আধ্যাত্মিক প্রচারের মাধ্যমে ঘটেছিলো।’ তবে আল মাহমুদের কাব্যিক দর্শনে ‘তরবারি’ এবং ‘জেহাদ’ কোনো বিধ্বংসী যুদ্ধ নয়, বরং এটি বেইনসাফির বিরুদ্ধে ইনসাফের দ্রোহ। ইসলামের মূল শিক্ষা সহনশীলতা এবং আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা, কিন্তু যখন মানুষ মানুষের ওপর জুলুম করে, বেইনসাফি করে, তখন ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ লাফিয়ে ওঠে। কবি তখন স্বপ্নের ভেতর ‘জেহাদ জেহাদ’ বলে জেগে ওঠেন, তখন সেটি মূলত তাঁর সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরাধীনতা থেকে মুক্তির এক আধ্যাত্মিক আকুতিতে রূপান্তরিত হয়।
লোকজ উপাদান ও ঐতিহ্যের সেতুবন্ধ
আল মাহমুদ আধুনিক বাংলা কবিতায় লোকজ উপাদানকে বৈশ্বিক ও আধুনিক ব্যঞ্জনায় উপস্থাপন করতে জানতেন। ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ কবিতায় তিনি ঐতিহ্যের বয়ান তৈরিতে ‘মায়ের ছড়া’ এবং ‘কেচ্ছা’ বা গল্পের আশ্রয় নিয়েছেন। বাংলার প্রতিটি ঘরে শিশুরা যেভাবে রূপকথা বা বীরত্বের গল্প শুনে বড় হয়, কবি সেই শৈশবস্মৃতিকে ইতিহাসের সাথে যুক্ত করেছেন এবং কবিতায় আধুনিক ফর্মের ছোট কবিতা নির্মাণ করলেও মহাকাব্যের প্যাটার্ন বা গল্পকে আশ্রয় করে সৃজন করেছেন। এই গল্পে তিনি বর্তমান অবস্থানে থেকে অতীতকে বর্ণনা করেছেন বর্তমানের মতোই চিত্রায়ণ করে। বিদ্যুৎহীন গ্রামীণ জীবনে মায়ের পাখা ঘোরানো আর ছড়া শোনানোর দৃশ্যটি বাংলাদেশের এক শাশ্বত চিত্র। এই ঘরোয়া আবহের মধ্যেই বীরত্বের বীজ বপন করা হয়। ‘এক দেশে এক রাজা ছিলো’ এভাবে শুরু করা গল্প বালককে টেনে নিয়ে যায় গল্পের শেষ দৃশ্য পর্যন্ত। এই প্যাটার্ন শুধু বাংলার নয়, আরব্য রজনীতেও এক অবোধ বাদশা গল্প শেষ হওয়ার তাগাদা নিয়ে ঘুমিয়ে যায়। মায়ের কেচ্ছায় বালক যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন তার স্বপ্নে অশ্বখুরের শব্দ শোনা যায় এবং তার স্বপ্নের নিশেন ওড়ে। লোকজ উপাদানের এই শৈল্পিক ব্যবহার আল মাহমুদকে আধুনিক বাংলা কবিতার ‘মহাকবি’ হিসেবে চিহ্নিত করে। এই কবিতায় তিনি দেখিয়েছেন, ঐতিহ্য কেবল ইতিহাসের পাতায় ধুলো জমা কোনো তথ্য নয়, বরং এটি আমাদের দৈনন্দিন বিশ্বাস, ধর্মে যাপন, ছড়া এবং লোকজ কাহিনীর ভেতর দিয়ে প্রবহমান এক জীবন্ত ধারা।
শৈশব ও ঐতিহ্যের মনস্তাত্ত্বিক সংযোগ
কবিতার বালকটি যখন বলে, “কে মা বখতিয়ার? আমি বখতিয়ারের ঘোড়া দেখবো”, তখন সেটি কেবল কৌতূহল নয়, বরং এটি একটি জাতির তার পূর্বপুরুষের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে জানার আকাঙ্ক্ষা। এই মাটিতে তার শেকড় কতোটা প্রথিত তা দেখে নেওয়ার প্রয়াস। মায়ের উত্তর “আল্লাহর সেপাই তিনি, দুঃখীদের রাজা” বালকের মনে বখতিয়ারের একটি ইতিবাচক ও মুক্তির প্রতিচ্ছবি তৈরি করে। এই মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই একটি শিশু তার জাতিগত পরিচয়ের সাথে পরিচিত হয়। তার জাতি কতোটা বীরত্বপূর্ণ, ইনসাফ কায়েমকারী, কল্যাণকামী সমাজের নির্মাণকারী- এসকল ইতিহাস পাঠের মাধ্যমে তার আত্মপরিচয় অনুসন্ধান করে। মাহমুদ অত্যন্ত নিপুণভাবে এই শৈশবস্মৃতিকে সমকালীন অস্তিত্বের সংকটের সাথে যুক্ত করেছেন। কবিতার শেষে যখন তিনি বলেন, “কোথায় সে বালক? আজ আবার হৃদয়ে কেবল যুদ্ধের দামামা মনে হয় রক্তেই ফয়সালা। বারুদই বিচারক”, তখন তিনি মূলত শৈশবের সেই স্বপ্নের অভাববোধ এবং বর্তমানের কঠিন বাস্তবতাকে তুলে ধরেন। বৈষয়িক যাপনের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়া বালকটিকে আবার জাগ্রত করার প্রয়াস লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। আমাদের বহুল পঠিত স্মৃতিতে দেখি ‘ধান ফুরালো পান ফুরালো খাজনার উপায় কী/আর কটাদিন সবুর করো রসুন বুনেছি।’ রসুনের মতো ঝাঁঝওয়ালা জাতিকে আবার জাগ্রত করাই কবির মকসদ।
আধ্যাত্মিক অন্বেষণ
মাহমুদের ঐতিহ্যের বয়ান কেবল রাজনৈতিক বিজয়গাথায় সীমাবদ্ধ নয়, এর গভীরে প্রোথিত রয়েছে সুফিচেতনা এবং আধ্যাত্মিক অন্বেষণ। তাঁর কবিতায় নিজের ভেতরে সত্য ও সত্তাকে তালাশ করার প্রবণতাই আধ্যাত্মিক চেতনারই প্রতিরূপ। তিনি বিশ্বাস করেন আল্লাহ দয়াময়। তাঁর ভালোবাসা হলো জগতের সব ইনসাফ, মমতা ও প্রেম; যা জাগতিক আকাঙ্ক্ষা মিথষ্ক্রিয়ার মাধ্যমে মানব জীবন সৌন্দর্য সুশোভিত করা। যদিও ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ একটি বীরত্বপূর্ণ কবিতা, এর প্রেক্ষাপটে কবির যে মুসলিম ঐতিহ্যের প্রতি অনুরাগ, তা আধ্যাত্মবাদের প্রভাবপুষ্ট। ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ থেকে শুরু করে তাঁর পরবর্তী কাব্যগ্রন্থগুলোতে ‘তসবির দানা’ বা ‘নুহের নৌকা’র মতো ইসলামিক ঐতিহ্যের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। ইসলামিক থিওলজিতে ভূমি বিজয়কে চূড়ান্ত বিজয় হিসেবে শনাক্ত করা হয় না। বিজয়কে সনাক্ত করা হয় জনগণের হৃদয়কে জয় করা। বখতিয়ার খলজির বিজয়কেও তিনি কেবল ভূমির বিজয় হিসেবে দেখেননি, বরং একে দেখেছেন এক ধরনের আধ্যাত্মিক বিপ্লব হিসেবে, যা বাংলার সাধারণ মানুষের মনোজগতকে আলোকিত করেছিলো। কুসংস্কারাচ্ছন্ন এক বদ্ধমূল চিন্তাকে পরিবর্তন করে পিছিয়ে পড়া এই জনগোষ্ঠীকে সমসাময়িক চিন্তার সাথে সংযোগ তৈয়ার করে দেয়া।
রাজনৈতিক সংকটে ঐতিহ্যের প্রাসঙ্গিকতা
‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ কবিতাটি কেবল অতীতের স্মৃতিচারণ নয়, এটি কবির সমকালীন অস্থিরতার এক শৈল্পিক প্রতিক্রিয়া। আশির দশক থেকেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত জটিল হয়ে ওঠে। স্বৈরাচারী শাসন, সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সংকট এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈয়ার হয়েছিলো। নব্বই দশকে স্বৈতন্ত্রের পরাজয়ের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবর্তন সাধিত হলেও আবার অস্থিরতা দেখা দেয়। এই পরিস্থিতিতে ধর্মের আশ্রয়ে ঐতিহ্যের স্মৃতিতে আল মাহমুদ এক ধরনের স্থিরতা ও শক্তির উৎস খুঁজে পেয়েছিলেন। তাই ইতিহাসকে নতুনভাবে নির্মাণের জন্য তার কবিতায় ঐতিহাসিক চরিত্রকে বর্তমানের সাথে সংযোগ স্থাপন করেন। সেই ধারাবাহিকতায় তার কবিতায় বাংলাদেশি চেতনা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রূপ নিয়েছে। ‘লোক লোকান্তর’-এ যা ছিলো গ্রামীণ প্রকৃতি, ‘সোনালী কাবিন’-এ তা হয়েছে কৌম দ্রোহ, আর ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’য় হয়েছে মুসলিম বীরত্বের বয়ান। ঐতিহ্যের এই সমকালীন পাঠই আল মাহমুদকে অন্য কবিদের থেকে আলাদা করে তোলে। তিনি অতীতকে বর্তমানের আয়নায় দেখেন এবং ভবিষ্যতের জন্য এক নতুন দিশা খোঁজেন। তাঁর এই ঐতিহ্যিক বয়ান তাই কেবল মুসলিম সম্প্রদায়ের আত্মপরিচয় নয়, বরং সমগ্র শোষিত মানুষের আত্মপরিচয় ও মুক্তির গান হয়ে ওঠে। কবি যখন বলেন, “বারুদই বিচারক”, তখন তিনি তাঁর সময়ের নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে জালিমশাহীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন। বখতিয়ারের অশ্বারোহীদের মতো এক পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেন।
কবিতার ছন্দ ও গতির শৈল্পিক গঠন
আল মাহমুদের কবিতার অন্যতম শক্তি হলো তাঁর শব্দচয়ন। বখতিয়ারের ঘোড়া কবিতায় তিনি আঞ্চলিক শব্দ এবং তৎসম বা বিদেশি শব্দের এক অসাধারণ মিশ্রণ ঘটান। কবিতায় ‘সতেরো সোয়ারি’, ‘নাঙ্গা তলোয়ার’, ‘খিড়কি’, ‘নিশেন’, ‘কেশর’, ‘সিনা’ এই শব্দগুলো এক ধরনের প্রাচীন ও বীরত্বপূর্ণ আবহ তৈরি করে। আবার ‘জেহাদ’, ‘বারুদ’, ‘দামামা’, ‘ফয়সালা’, ‘সেপাই’ এই শব্দগুলো কবিতার গাম্ভীর্য ও যুদ্ধের আবহকে ফুটিয়ে তোলে। আর ‘আজান’, ‘মোমেন’, ‘পূজা’ ধর্মের বিষয়কে প্রাসঙ্গিক করে তোলে। শব্দ ব্যবহারের পাশাপাশি আল মাহমুদ কবিতায় ছন্দ ও নির্মাণে অত্যন্ত গতিশীল। অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত ও স্বরবৃত্তের ছন্দের ব্যবহারের পাশাপাশি গদ্যরীতির কবিতাতেও মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ কবিতায় এক ধরনের গতিশীল ছন্দ বিদ্যমান, যা অশ্বখুরের শব্দের মতো পাঠকের কানে অনুরণিত হয়। কবিতার পংক্তিগুলোর দৈর্ঘ্য এবং যতি চিহ্নের ব্যবহার এমনভাবে করা হয়েছে যে, পাঠক যখন এটি পাঠ করেন, তখন তিনি বখতিয়ারের অশ্বারোহী বাহিনীর দ্রুতগতির এক অনুভূতি পান। ছন্দের গতির পাশাপাশি চিত্রকল্প নির্মাণও অত্যন্ত নিপুণ। “নিজের দিলের শব্দ বালিশের সিনার ভিতর/ সে ভাবে সে শুনতে পাচ্ছে ঘোড়দৌড়”- এখানে বালিশের নরম স্পর্শের বিপরীতে ঘোড়ার শক্ত ক্ষুরের শব্দের কল্পনাটি এক ধরনের সেন্সরি কন্ট্রাস্ট বা ইন্দ্রিয়জ বৈপরীত্য তৈরি করে। আবার “মায়ের কেচ্ছায় ঘুমিয়ে পড়ে বালক/তুলোর ভেতর অশ্বখুরের শব্দে স্বপ্ন তার/নিশেন ওড়ায়” পঙক্তিটিতে ‘তুলো’ এবং ‘নিশেন’র রূপকটি বালকের কোমল শৈশব এবং বিশাল উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে একসাথে মূর্ত করে তোলে। “আল্লাহর সেপাই তিনি দুঃখীদের রাজা/যেখানে আজান দিতে ভয় পান মোমেনেরা/আর মানুষ করে মানুষের পূজা/‘সেখানেই আসেন তিনি। খিলজীদের শাদা ঘোড়ার সোয়ারি” এখানে ‘আল্লাহর সেপাই’ একজন ন্যায়বান শাসক, তাঁর বিপরীত চরিত্র চিত্রণ করেন ‘মানুষ করে মানুষের পূজা’ একজন জালিম শাসকের চিত্র উপস্থাপন করা হয়, যে মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে। একই সাথে তিনি ‘শাদা ঘোড়ার সোয়ারি’র মাধ্যমে সূফি ও আধ্যাত্মিক চরিত্র অঙ্কন করেন, যে মানুষকে ভালোবাসে, মানুষের মুক্তির পথ দেখায় এবং সামষ্টিক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে না।
ঐতিহ্যের বয়ানে আত্মপরিচয়
আল মাহমুদের কবিতায় ঐতিহ্য সন্ধান শেষ পর্যন্ত বাঙালি মুসলিম জাতিসত্তার আত্মপরিচয় নির্মাণের এক শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন, একটি জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব টিকে থাকে তার জ্ঞান, ধর্ম ও সর্বোপরি ইতিহাসের স্মৃতির ওপর। ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ কবিতায় তিনি সেই স্মৃতিকে পুনর্জাগরিত করেছেন। দেখিয়েছেন বাঙালাভাষী মুসলমান কেবল এই মাটির সন্তানই নয়, বরং তার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার যুক্ত রয়েছে মধ্য এশিয়ার ইসলাম প্রচারক, জগৎজয়ী বীর এবং ইসলামের সাম্যবাদী আদর্শের মধ্যে। বাংলার প্রাকৃতজন ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সংমিশ্রণের মানুষের আত্মপরিচয় সংকট প্রকট হয়ে উঠলে তার থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে মাহমুদ আশ্রয় নেন ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কাছে। ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ কবিতার বয়ান সেই অন্বেষণেরই একটি অংশ। এই ঐতিহ্যের বয়ান আল মাহমুদকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে নিজের আয়নার সামনে। তিনি যখন বলেন, “আমি ইসলামকেই আমার ধর্ম... ইহলোক ও পারলৌকিক শান্তি বলে গ্রহণ করেছি”, তখন সেটি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাস নয়, বরং তাঁর কবিস্বভাবেরই অংশ। তাঁর এই উচ্চারণ সমসাময়িক কবিদের থেকে তাঁকে পৃথক করে দেয় এবং তাঁকে ‘আত্মপরিচয় সন্ধানী মানুষের কবি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
‘বখতিয়ারের ঘোড়া’র স্থায়ী প্রভাব ও তাৎপর্য
আল মাহমুদের ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ এই ছোট কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক মহাকাব্যিক রূপান্তর। রূপান্তরিত এই কবিতা কেবল একটি ঐতিহাসিক বীরত্বের কাহিনী নয়, বরং এটি একটি জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের শৈল্পিক পুনর্নিমাণ। কবি অত্যন্ত নিপুণভাবে শৈশবস্মৃতি, লোকজ আবহ, ঐতিহাসিক তথ্য এবং আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসাকে এক সুতোয় গেঁথেছেন। বখতিয়ার খলজির বিজয়কে কেন্দ্র করে কবি যে ঐতিহ্যিক বয়ান তৈরি করেছেন, তা বাঙালি মুসলমানের মনোজগতে আত্মপরিচয়ের সংকটকে মোকাবেলা করেছে। এই বয়ানে স্পষ্ট হয়েছে- ঐতিহ্য কেবল ইতিহাস নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ ও আত্মপরিচয়ের নিয়ামক। ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’র যে আজান আল মাহমুদ তাঁর কবিতার সিনায় গেঁথে দিয়েছেন, তা আজও বাংলা সাহিত্যের আকাশে এক প্রতিবাদী, সাহসী এবং আত্মপরিচয়মূলক সুর হিসেবে প্রতিধ্বনিত হয়। আল মাহমুদের এই কাব্যিক ঐতিহ্য অনুসন্ধান প্রক্রিয়াটি বাংলা কবিতাকে যেমন সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি এটি একটি শোষিত ও সংগ্রামী জনগোষ্ঠীর জন্য জোগায় প্রেরণা ও আত্মবিশ্বাসের রসদ।
‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ কবিতা রচনার শানে নুযুল
বাংলাদেশপন্থি মানুষদের আত্মপরিচয়কে জাগ্রত করার জন্য ১৯৯৭ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজির বঙ্গবিজয়ের ৭৯৩তম বার্ষিকী উদযাপনের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়, যার নামকরণ করা হয় ‘বঙ্গবিজয়ের ৭৯৩তম বার্ষিকী উদযাপন কমিটি’। এই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন নাট্যব্যক্তিত্ব আরিফুল হক, সদস্য সচিব কবি আবদুল হাই শিকদার এবং সদস্য ছিলেন কবি আল মাহমুদ, চলচ্চিত্র পরিচালক হাফিজ উদ্দিন, সাংবাদিক মাসুদ মজুমদার, সাংবাদিক এলাহী নেওয়াজ খান, ড. আবদুর রব, ডা. স.ম. রফিক, কবি মতিউর রহমান মল্লিক, জনাব তোফায়েল আহম্মদ খান, জনাব আলম মাসুদ, শিল্পী রফিকুন নবী, জনাব হাফিজুর রহমান, শিল্পী হাসনাত আবদুল কাদের, জনাব মহিবুল্লাহ, জনাব আরকান উল্যাহ হারুনী এবং জনাব এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। এই আয়োজনের পেছনে ছিলেন জনাব মীর কাসেম আলী। এ উপলক্ষে আয়োজন করা হয় একটি ব্যতিক্রমী র্যালি। র্যালির শুরুতে ১৭টি ঘোড়া রাখা হয়। যেখানে বাংলাদেশের সকল শ্রেণির মানুষের সাথে যোগ দেন শিল্পী, অভিনেতা, সাহিত্যিক, শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীবৃন্দ। র্যালি শেষে আয়োজন করা হয় সেমিনার। এই সকল বিষয় নিয়ে প্রকাশ করা হয় ‘প্রথম প্রভাত’ নামে বঙ্গবিজয়ের ৭৯৩তম বার্ষিকী স্মারক। এই স্মারকের জন্য কবি আল মাহমুদ লেখেন ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ শিরোনামের বিখ্যাত কবিতাটি, যা পরবর্তীতে এই নামেই একটি বই প্রকাশ করেন। বইটি প্রকাশ করে বাংলা সাহিত্য পরিষদ। কবিতাটি একবার আমরা পড়ে দেখি...
বখতিয়ারের ঘোড়া
মাঝে মাঝে হৃদয় যুদ্ধের জন্য হাহাকার করে ওঠে
মনে হয় রক্তই সমাধান, বারুদই অন্তিম তৃপ্তি;
আমি তখন স্বপ্নের ভেতর জেহাদ, জেহাদ বলে জেগে উঠি।
জেগেই দেখি কৈশোর আমাকে ঘিরে ধরেছে।
যেন বালিশে মাথা রাখতে চায় না এ বালক,
যেন ফুৎকারে উড়িয়ে দেবে মশারি, মা
তৃস্তনের পাশে দু’চোখ কচলে উঠে দাঁড়াবে এখুনি;
বাইরে তার ঘোড়া অস্থির, বাতাসে কেশর কাঁপছে।
আর সময়ের গতির ওপর লাফিয়ে উঠেছে সে।
না, এখনও সে শিশু। মা তাকে ছেলে-ভোলানো ছড়া শোনায়।
বলে, বালিশে মাথা রাখো তো বেটা। শোনো
বখতিয়ারের ঘোড়া আসছে।
আসছে আমাদের সতেরো সোয়ারি।
হাতে নাঙ্গা তলোয়ার।
মায়ের ছড়াগানে কৌতূহলী কান পাতে বালিশে
নিজের দিলের শব্দ বালিশের সিনার ভিতর।
সে ভাবে সে শুনতে পাচ্ছে ঘোড়দৌড়। বলে, কে মা বখতিয়ার?
আমি বখতিয়ারের ঘোড়া দেখবো।
মা পাখা ঘোরাতে ঘোরাতে হাসেন,
আল্লাহর সেপাই তিনি দুঃখীদের রাজা।
যেখানে আজান দিতে ভয় পান মোমেনেরা,
আর মানুষ করে মানুষের পূজা,
সেখানেই আসেন তিনি। খিলজীদের শাদা ঘোড়ার সোয়ারি।
দ্যাখো দ্যাখো জালিম পালায় খিড়কি দিয়ে
দ্যাখো, দ্যাখো।
মায়ের কেচ্ছায় ঘুমিয়ে পড়ে বালক
তুলোর ভেতর অশ্বখুরের শব্দে স্বপ্ন তার
নিশেন ওড়ায়।
কোথায় সে বালক?
আজ আবার হৃদয়ে কেবল যুদ্ধের দামামা
মনে হয় রক্তেই ফয়সালা।
বারুদই বিচারক। আর
কোন মন্তব্য নেই