Header Ads

Header ADS

খন্দকার আবদুল মোমেনের সাহিত্য সাধনা ও তার সাহিত্য সম্পাদকের দায় ।। আফসার নিজাম




খন্দকার আবদুল মোমেনের সাহিত্য সাধনা ও তার সাহিত্য সম্পাদকের দায় ।। আফসার নিজাম


সাহিত্য জিনিসটা তো আর খালি কাগজে ছাপা কিছু অক্ষরের মিছিল না- এইডা হইলো আস্ত একটা জাতির দিলের আয়না, চিন্তার দর্পণ, রুচি আর আত্মপরিচয়ের একখান নান্দনিক দলিল। একটা সমাজের মানুষরা কেমন কইরা ভাবে, কেমন কইরা খোয়াব দেখে, কেমন কইরা নিজের অতীত আর বর্তমানরে বুঝতে চায়- সেইসব খবরাখবর অনেক সময় সাহিত্যের কাগজেই লিপিবদ্ধ হয়। এই সাহিত্যরে গুছায়া, শান দিয়া, পাঠকের দরবারে একদম কায়দামতো হাজির করার পেছনে যে মানুষটার দিন-রাতের মেহনত থাকে, তিনি হইলেন সাহিত্য সম্পাদক। সম্পাদক মানে খালি নোকতা আর হরফের ভুল ধরা কারিগর না, প্রুফ দেখার মামুলি লোকও না। একজন আসল সম্পাদক হইলেন একাধারে এক জবরদস্ত নির্মাতা- যিনি একটা কাঁচা পাণ্ডুলিপির ভিতরের আসল রুহটা চিনতে পারেন, তার লেখনীর ধার বাড়ান, ভাবনার ভাঁজগুলা খুইলা দেন, আর লেখাটারে এমন এক কুদরতি রূপ দেন যা পইড়া পাঠকের দিল থমকাইয়া দাঁড়ায়।

আগেকার জমানায় সাহিত্য সম্পাদনার এই কাম আছিল একধরনের সাধনা। একটা লেখা কেমন হইবো, কোন লেখা জমানার সাক্ষী হইয়া জিন্দা থাকবো, কোন তরুণের কলমে ভবিষ্যতের আশার আলো লুকাইয়া আছে- এইসব বুঝার লাইগা সম্পাদকের দরকার হইতো কিতাবের গভীর পাঠ, খাস রুচি আর দূরদর্শিতা। একটা সাহিত্য পত্রিকা সাজানোও কিন্তু কম বড় শিল্প না! কোন লেখার পাশে কোন চিত্র যাইবো, কোনখানে নকশা-অলঙ্করণ বসবো, কোন উক্তিটা আলাদা কইরা চোখের মণি হইয়া উঠবো, পৃষ্ঠার বিন্যাসটাই বা কেমন শানদার হইবো- এইসবের মধ্য দিয়াই তো একটা কাগজের নিজস্ব আখলাক আর খাসিয়ত গইড়া ওঠে। এই সম্পাদনা মধ্য দিয়াই একজন সম্পাদক আসলে নিজের লেখালিখির পাশাপাশি পত্রিকার একটা আলাদাই বয়ান ও নান্দনিক জগত তৈয়ার করেন। 

তবে সাহিত্য সম্পাদকের এই জিম্মাদারি খালি সুন্দরের অন্দরে থাইকা শেষ হয় না। তাহজীব-তমুদ্দুনের রুচি, চিন্তা আর সংস্কৃতির গতিপথ বদলাইয়া দেওয়ার কিংবা নিজস্ব ঐতিহ্যরে হেফাজত করার পেছনে তার একটা বড় রকমের ভূমিকা থাকে। অনেক সময় সম্পাদককে বাজারের চাপ, গোষ্ঠীর টানাপোড়েন, মতাদর্শের সংঘাত আর নানা পদের ফেরকার ভিতর দিয়া সাবধানে পথ চলতে হয়। এই দুনিয়াবি ফেরকার গোলকধাঁধায় পইড়াও যে সম্পাদক জাতিগত আর ব্যক্তিগত স্বার্থের ওপরে উইঠা সত্য আর সুন্দরের পক্ষ নেন, সেই সম্পাদকই হইলেন আসল খাঁটি সম্পাদক। আহসান হাবীব, সিকান্দার আবু জাফর, আবদুল মান্নান তালিব, আবুল হাসনাত কিংবা মাওলানা আকরম খাঁর মতো দিলদার সম্পাদকরা দেখাইয়া গেছেন-ু সাহিত্য সম্পাদনা শুধু কাগজ চালাবার কাম না, এইডা হইলো এক ধরনের সাংস্কৃতিক আমানত রক্ষা করা। খন্দকার আবদুল মোমেন সেই আমানত রক্ষাকারী নিভৃতচারী সম্পাদক। যিনি নিজের নামের রোশনাই খোঁজার পিছে দৌঁড়ান নাই; বরং অন্যের প্রতিভার চেরাগ জ্বালাইতেই ভালোবাসতেন। নিজেরে পিছনে রাইখা অনুজ আর গুণীজনের সৃষ্টিশীলতারে আসমানের তুইলা ধরতেন। দিল খুলিয়া জায়গা কইরা দিতেন- এইডাই ছিল তাঁর জিন্দেগীর এক বড় বৈশিষ্ট্য।

১৯৪৭ সালের ২৫ আগস্ট, দেশ স্বাধীন আর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সন্ধিক্ষণে উত্তরবঙ্গের গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার চন্ডিপুর ইউনিয়নের সীচা গ্রামে পয়দা হন। শৈশবের সেই সবুজ-শান্ত কুদরত, গ্রামের মাটি আর মানুষের সহজ জীবন তাঁর ভিতরের সাহিত্যিক সত্তাটারে একদম গোড়া থেইকা গড়িয়া তুলছিল। পড়াশোনার হাতেখড়িও সেই গাইবান্ধায়। ১৯৬৪ সালে গাইবান্ধা মডেল হাইস্কুল থেইকা মেট্রিক পাশ করেন। পরে গাইবান্ধা সরকারি কলেজ থেইকা উচ্চ মাধ্যমিক শেষ কইরা ঐতিহ্যবাহী কারমাইকেল কলেজে বাংলা সাহিত্যে পড়াশোনা করেন। ১৯৭৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেইকা বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি হাসিল করেন। শিক্ষকতার প্রতি দিলের টান কারণে ১৯৭৮ সালে রাজশাহী টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেইকা বি.এড ডিগ্রিও লন। তার এই শিক্ষকতার জিন্দেগীও আছিল বিচিত্র অভিজ্ঞতায় ভরপুর। প্রাথমিক ইশকুল, মাধ্যমিক ইশকুল, মাদরাসা থেইকা শুরু কইরা উচ্চশিক্ষার আংগিনা পর্যন্ত তিনি জ্ঞানের আলো বিলাইছেন। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী তামিরুল মিল্লাত মাদরাসায় অধ্যাপনার মধ্য দিয়া তাঁর কর্মজীবনের এক আলিশান অধ্যায় শুরু হয়। পরে দারুল ইহসান ইউনিভার্সিটির শিক্ষা বিভাগে কোর্স কো-অর্ডিনেটর এবং এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি নর্দান ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ ইসলামী ইউনিভার্সিটি আর আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়েও বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পড়াইছেন। শুধু শিক্ষকতা না, সমাজ আর সংস্কৃতির ময়দানেও তিনি ছিলেন পুরা দমে এক্টিভ। ‘সাহিত্য সংস্কৃতি কেন্দ্র’-এর সভাপতি এবং ‘বাংলা সাহিত্য পরিষদ’-এর পরিচালক হিশেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জিন্দেগীর শেষ সময়ে মোহাম্মদপুরে নীরবে দিন কাটাইছেন এই বুজুর্গ মানুষটি। ২০২৫ সালের ১৩ জুন শুক্রবার দিবাগত রাতে ঢাকার একটা প্রাইভেট হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হইয়া তিনি ইন্তেকাল করেন। তখন দুনিয়ার হিসাবে তার বয়স হইছিল ৭৮ বছর। রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁরে দাফন করা হয়। 

খন্দকার আবদুল মোমেনের সাহিত্যিক শান-শওকত বুঝতে হইলে তার সম্পাদিত ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘প্রেক্ষণ’-এর দিকে নজর দিতে হইবো। ১৯৯৩ সালে তিনি নিজের তাগিদে এই পত্রিকার সফর শুরু করেন। নামের মধ্যেই ছিল এক গভীর ইশারা। কবি ফররুখ আহমদের একটা কবিতার নাম থেইকা ‘প্রেক্ষণ’ নামটা পছন্দ করছিলেন কবি মতিউর রহমান মল্লিক। কবি বন্ধুর সেই নামটিই রেখে দিলেন তার পত্রিকার নাম হিশেবে। বাংলা সাহিত্য পরিষদের সহযোগিতা আর আবদুল মান্নান তালিব ও সাইফুল্লাহ মানছুরের মতো সাহিত্যসেবীদের আন্তরিক কোশেশে ১৯৯৪ সালের ১১ মার্চ ‘প্রেক্ষণ ফররুখ স্মরণ’ নামে এর পয়লা সংখ্যা প্রকাশ করেন। ফররুখ আহমদ ছিলেন বাংলা সাহিত্যের আসমানের এক উজ্জ্বল সিতারা। কিন্তু তাঁর আকিদা, বিশ্বাস আর সাংস্কৃতিক অবস্থানের কারণে তারে অনেক সময় সময় একপেশে মূল্যায়নের মুখোমুখি হইতে হয়েছে, নানাবিধ জুলুমের মুখোমুখি হইতে হইছে। খন্দকার মোমেন ঠিক এই নাজুক জায়গায় বুক চিতাইয়া দাঁড়াইয়া সাহিত্যিক ইনসাফের পক্ষে আওয়াজ তুলছেন, ন্যায়বোধের পক্ষে কথা বলেছেন। ‘প্রেক্ষণ’-এর প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয়তে তিনি যে সাহসী বয়ান দিছিলেন, তার মূল কথা ছিল- সাময়িক মেঘ সূর্যরে ঢাকতে পারে, কিন্তু সূর্যের আলো নিভাইতে পারে না। 

এই পত্রিকা আর দশটা সাহিত্য সাময়িকীর মতো আছিল না। এর একেকটা সংখ্যা আছিল ইলম আর গবেষণার একেকটা আকরগ্রন্থ, একেকটা জ্যান্ত মহাফেজখানা। হারাইয়া যাওয়া কুতুব-মনীষী, অবহেলিত সাহিত্যিক আর ভুইলা যাওয়া শানদার ঐতিহ্যরে দুনিয়ার সামনে হাজির করাই ছিল এর আসল মাকসাদ। কবি আল মাহমুদ সংখ্যা, ফররুখ সংখ্যা— সব মিলাইয়া ‘প্রেক্ষণ’ হইয়া উঠছিল শেকড় সন্ধানের এক অনন্য মোকাম। খন্দকার আবদুল মোমেন নিজের লেখার চেয়ে অন্যের লেখারে জায়গা দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। তবুও তার নিজস্ব বয়ান আর রচনার ভিতরেও পাওয়া যায় গভীর মনন আর চিন্তার ছাপ। ২০০৫ সালে প্রকাশিত তার প্রবন্ধের কিতাব ‘প্রকৃষ্ট বন্ধন’ তার চিন্তার এক মূল্যবান দলিল। এই কিতাবে তিনি বাঙালির আত্মপরিচয়, ইতিহাসবোধ আর সাংস্কৃতিক অবস্থান লইয়া গভীর অনুসন্ধান করছেন। তিনি মনে করতেন নিজেরে আসলি সুরতে চিনতে না পারলে কোনো কওম বা জাতির প্রকৃত বিকাশ মুমকিন না। অন্যের রঙে রাঙাইয়া না, নিজের তাহজীব আর শেকড়ের শক্তিতেই ময়দানে খাড়াইতে দাঁড়াইতে হয়। তাঁর কবিতাতেও ছিল প্রকৃতির সৌন্দর্য, মানুষের প্রতি মমতা আর আর মালিকের প্রতি গভীর সমর্পণের এক এলাহী সুর। 

খন্দকার আবদুল মোমেন ছিলেন এমন এক দিলের মানুষ, যিনি সাহিত্য সম্পাদনার জিম্মাদারি আর দায়রে নজির নিজের জিন্দেগী দিয়া বুঝাইয়া গেছেন। তিনি দুনিয়াবি খ্যাতির পেছনে দৌড়ান নাই, বরং সাহিত্যের এক দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ গড়ার কাজে নিজেরে নিয়োজিত রাখছিলেন। যেই জমানার অনেক পত্রিকার সস্তা পপুলারিটি আর বাজারের সওদার হিসাব নিকাশের পিছে ছুটতাছিলো, সেই খলবলা সময়ে খন্দকার আবদুল মোমেন তালাশ করছেন ইতিহাস, ঐতিহ্য আর মনের গভীরতা। তার ‘প্রেক্ষণ’ তো খালি একটা সাহিত্য পত্রিকা না- এইডা হইলো আমাগো এক আস্ত সাংস্কৃতিক দলিল। তার এই জিন্দেগীর কাম কাজ দেখাইয়া দেয়, একজন সম্পাদক কেবল হরফের পাহারাদার না; তিনি আসলে জমানার স্মৃতি রক্ষা করার আসল মুহাফিজ। আজ তার এই না-থাকার দিনে, তার নিজের হাতের সৃষ্টি আর সম্পাদিত কিতাবগুলা বাংলা সাহিত্যের আশেক আর গবেষকদের কাছে একেকটা আসলি আলোর বাতিঘর। লাইমলাইটের চকমকানি ছাড়াও যে একজন নিভৃতচারী সাধক ইতিহাসের পাতায় নিজের স্থায়ী গদিখানা জাঁকাইয়া বসাইতে পারেন, তার জ্যান্ত প্রমাণ খন্দকার আবদুল মোমেনের এই সাহিত্য সাধনা।


কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.