Header Ads

Header ADS

ফ্যাসিস্ট সাহিত্যের সম্মোহনী উন্মাদনা ।। আফসার নিজাম

 





ফ্যাসিস্ট সাহিত্যের সম্মোহনী উন্মাদনা
আফসার নিজাম

বিংশ শতাব্দীর তামাম দুনিয়ার পলিটিক্স আর সংস্কৃতির ইতিহাসে ফ্যাসিবাদের উত্থান, এইডা কেবল একটা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অদলবদল আছিল না। এইডা আছিল মানুষের দিলের মইধ্যে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর আর সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের এক খতরনাক রূপ। ফ্যাসিবাদ জিনিসটা আসলে কী? এইডা হইলো একাধারে উগ্র-জাতীয়তাবাদ, জবরদস্তিমূলক কর্তৃত্ববাদ আর একটি বিশেষ ধরণের মানসিক বিকৃতির মিশেলে তৈরি হওয়া একটি আদর্শ। কর্তৃত্ববাদীরা নিজের গদি পোক্ত করার লাইগা শিল্প-সাহিত্য আর সংস্কৃতির মাধ্যমগুলোকে বানাইছিল তাগো আসল হাতিয়ার। এই মতাদর্শের আসল ধান্দাই আছিল কওমের পৌরাণিক কাহিনীগুলারে নতুন কইরা সাজানো, বীরত্বগাথার মইধ্যে রঙ চড়াইয়া ফাঁপায়া তোলা, আর সমষ্টিগত পরিচয়ের মধ্যদিয়ে ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও স্বাধীনতারে চিরতরে কোরবানি দেওয়া।
ফ্যাসিবাদী সাহিত্য সাধনার খতিয়ান দেখলে বুঝা যায়, এইডা খালি সস্তা প্রচারণার লিখন আছিল না; এইডা আছিল এক্কেবারে সুপরিকল্পিত প্রজেক্ট। এর মকসদই আছিল আমজনতার আক্কেল-বুদ্ধিরে অবশ কইরা দিয়া তাগোরে এক কিসিমের ‘সম্মোহনী উন্মাদনায়’ চুবায়া রাখা। এই সাহিত্য চর্চার আসল চাবিকাঠি আছিল ‘পালিঞ্জেনেসিস’, যার সোজা বাংলা হইলো জাতীয় পুনর্জন্মের আকাঙ্ক্ষা। এই ফ্যাসিস্টগুলা মনে করত, তাগো কওম বা রাষ্ট্র এক গভীর পচন, বেইজ্জতি আর পতনের চিপায় পইড়া গেছে; এখন কেবল একজন ‘ত্রাতা’ বা ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে থাকা জাঁদরেল নেতার উসিলাতেই এই জাতির উদ্ধার সম্ভব। এই খায়েশ থেইকাই তারা সাহিত্যরে এমনভাবে ছাঁচে ঢালাই করছিল, যাতে অতীতের শানদার ইতিহাসরে এনে বর্তমানের সব মুসিবতের দাওয়াই হিশেবে খাড়া করা যায়। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধে চেতনার নামে বাঙালি জাতীয়তাবাদের গম্বুজ খাড়া করে। এই বয়ানরে ইস্টাবিলিস্ট করার খায়েশে কাজ করেন শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গণের ফ্যাসিস্টরা। যাদের মধ্যে রামেন্দু মজুমদার, নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, মুনতাসীর মামুন, শাহরিয়ার কবির, ইমদাদুল হক মিলন, জাফর ইকবাল, হুমায়ূন আহমেদ, সম্পারেজা, খেলোয়ার শাকিব আল হাসান গংয়েরা। তারা কইতে থাকে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাইরে সবাই কিল করার যোগ্য, তাগো ওপরে বেইনসাফি হইলে তার কোনো বিচার লাগব না। তারা সমাজের অচ্ছুত প্রাণীর মতো। তাগো মাইরা ফালাইলেও অপরাধ না। আবরার ফাহাদরা এই কিসিমের জুলুমের শিকার হইয়া শহিদ হইছেন।
ইতালির বেনিতো মুসোলিনি তো ‘আর্তে দি স্তাতো’ বা রাষ্ট্রীয় শিল্পের এক নতুন ফতোয়া জারি করলেন। এর চক্করে পইড়া সাহিত্যিকরা বাধ্য হইলো ইতালীয় জাতীয়তাবাদ আর সাম্রাজ্যবাদী শান-শওকতের কাসিদা গাইতে। গ্যাব্রিয়েল ডি’আন্যুনজিও-র মতো লেখকরা ফ্যাসিবাদী সাহিত্যের একেকজন রোল মডেল হিশেবে ময়দানে নাইমা গেলেন, যাগো কিতাবাপত্তরে চরম জাতীয়তাবাদ আর নান্দনিকতার নামে শোষণ আর সহিংসতার জয়গান গাওয়া হইলো। জার্মানিতে নাৎসি জমানায় এই কারবার আরও ভয়াবহ রূপ নিল। হেইখানে পয়দা হইলো ‘ব্লুট উন্দ বোডেন’ বা ‘রক্ত ও মাটি’ মার্কা সাহিত্য, যা জাত, জমিন আর জাতীয়তাবাদী পরিচয়ের মইধ্যে এক আধ্যাত্মিক আর রহস্যময় সংযোগ স্থাপনের কোশেশ করত। এই সাহিত্যে গাঁও-গেরামের জিন্দেগিরে আসমানে তোলা হইতো, আর শহরের আধুনিকতা বা বিশ্বজনীনতাকে দেখা হতো জাতীয় শুদ্ধির পথে কাঁটা হিশেবে। বাংলাদেশে ফ্যাসিস্ট রিজম ফতোয়া জারি করলো। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর বাঙালি জাতীয়তাবাদের বাইরে কোনো চিন্তাভাবনা এখানের পত্রিকায় লেখা যাইব না। শেখ মুজিবুর আর তার পরিবারকে মহিমান্বিত কইরা লিখতে হবো। তাগো পাপের কথা কওয়া যাইব না। বাঙালির সংস্কৃতির নামে হিন্দুয়ানি সংস্কৃতিরে ধারণ করতে হইবো। হিন্দুয়ানি সংস্কৃতিরে না মানলে সে বাংলাদেশ বিরোধী। রাজাকার, আলবদর, মৌলবাদী আর জঙ্গী কইয়া নির্যাতন যোগ্য কইরা তুলত। এই জন্য তারা সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্র, শিল্প তৈয়ার কইরা মানুষের মগজ সাফ করত।
এই যে গোটা সাহিত্যিক ডালপালা গজাইছিল, এর আসল মকসদ আছিল পাবলিকের দিলের মইধ্যে একটা পাকাপোক্ত ‘অবরুদ্ধ মানসিকতা’ বা ঝরবমব ঝরবমব সবহঃধষরঃু গড়ে তোলা। এর চক্করে পইড়া মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করত যে, তাগো জাতি বুঝি চারপাশ থেইকা দুশমন দিয়া ঘেরা, আর এখন খালি লাঠির জোর, মিলিটারি পাওয়ার আর কড়া ডিসিপ্লিনই তাগো অস্তিত্ব রক্ষা পারে। এই পলিটিক্যাল আর সাহিত্যিক চালচলনের গভীরে আছিল এক রুগ্ন মনস্তত্ত্ব, যার আসল শিকড় পোঁতা আছিল শৈশব থেইকা বয়ে বেড়ানো অবদমিত ডর আর ট্রমার মইধ্যে। সাইকোলজিক্যাল অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে, এই ফ্যাসিস্ট কিসিমের পাবলিকেরা ছোটবেলায় চরম জুলুম বা কড়া শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট আছিল। এইডার লাইগা তাগো অবচেতন মনে এক গভীর ক্ষমতাশূন্যতা আর আত্ম-ঘৃণার জন্ম নেয়। এই অবদমিত ক্ষোভ ও ঘৃণা যখন চড়া রূপ নেয়, তখন তারা সচেতনভাব হারায়া ফালায়। এর ফলে তাগো আসল অত্যাচারীরে চিনতে পারে না। ফল যা হওয়ার তাই হয়, এই জমানো গোসসা আর নফরত তারা অন্য কোনো নিরীহ বা নিরাপদ গোষ্ঠীর ওপর ‘ডিলুশনাল প্রজেকশন’ বা ভ্রান্ত প্রক্ষেপণের মাধ্যমে চাপায়া দেয়। বাংলাদেশে পাকিস্তানের ভয় জিন্দা রাখত। তারে দেখাইয়া মানুষগো একলগে করত। দাড়ি-টুপি পরা মানুষগো দানব হিশাবে হাজির করত। তাগো শিল্প সাহিত্য চলচ্চিত্রে এমন এক রূপে খাড়া করত যেন তারা দুনিয়ার দাজ্জাল। আদতে এই নিরীহ মানুষগুলারে তারা নর্দমার কিট বানাইয়, বনের হায়েনা বানায়া মাইরা ফালানর মওকা খুঁজত। হাজার মাইল দূরের জুজুর ভয় দেখায় কিন্তু পাশের দেশের সীমান্ত হত্যাকে নরমালাইজ করা দেখার কোশেশ করে। মূলত এই চিন্তার মধ্যদিয়ে তাদের বিকৃত মানসিকতার পর্দা খুইলা যায় বাংলাদেশের মানুষের কাছে। এইপরই বিপ্লব হয়। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে পালায়া যায় ফ্যাসিস্ট রিজম।
এই মানসিক বৈকল্যের কারণে তাগো মইধ্যে সহিংসতার প্রতি তীব্র আসক্তি পয়দা হয়, যা তাগো ভেতরের লুকায়া থাকা ভয় থেইকা সাময়িক রেহাই বা এক ধরণের ইৎরবভ, ফবষঁংরড়হধষ ৎবষরবভ এনে দেয়। একই লগে তাগো মইধ্যে এক অন্ধত্বের দাপট দেখা দেয়। ছোটবেলার সেই সামাজিক আতঙ্কের চক্করে তাগো দিলে মহব্বত বা সহানুভূতির বদলে ঘৃণা ও প্রতিহিংসার জন্ম হয় আর বদলা নেওয়ার খায়েশ জাগে। বিবেক-বুদ্ধির বিকাশ এক্কেরে লাটে ওঠার কারণে তারা অবলীলায় অন্যের ওপর নির্মম জুলুম চালাইতে পারে। তারা হাকিকত বা সত্যরে যমের মতো ডরায়, আর অত্যন্ত সংকীর্ণ ও গোঁড়া বিশ্বাস আঁকড়ে ধইরা যুক্তি-তর্করে মনে করে দুর্বলতা। ক্ষমতার উপাসনা বা ‘চড়বিৎ ড়িৎংযরঢ়’ হইলো তাগো আসল লক্ষণ; যেইখানে তারা শক্তিশালীকে শ্রদ্ধা ও দুর্বলকে ঘৃণা করে। এই যে ভেতরের প্যানিক, আত্ম-ঘৃণা, দিলের কাঠিন্য আর ভীরুতার কোলাজ; এইডাই ফ্যাসিস্টগো বাধ্য করে এমন সাহিত্য রচনা করতে বা পড়তে, যা তাগো ভেতরের এই রুগ্ন মানসিকতারে মহিমান্বিত কইরা দুনিয়ার সামনে উপস্থাপন করে। আমরা দেইখা থাকি তাগো বিকৃতির রূপ। ২০১৮ সালে কিশোরগো নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময়ে শিশুদের আঘাত করতে তাদের দিলে চোট লাগে নাই। এই যে সহিংসতার প্রতি তাদের আসক্তি তা তোগো পুরো গোষ্ঠীর মধ্যে ছড়াইয়া পড়ছে। এই লাইগা তারা প্রশাসনের রন্দ্রে রন্দ্রে তাগো লোক বসাইছে। যাতে করা ক্ষমতার নিশান তাগো হাতে ধরা থাকে। এই পর ২০২৪ আন্দোলনের সময় খুব কাছ থেইকা পুলিশের গুলি করা, হেলিকপ্টারে করা শিশু হত্যা করা এইগুলা ফ্যাসিস্টদের বিকৃত চিন্তার ফসাল। তাদের মনের মধ্যে ঝাইকা বসে তাগো নেতা ছাড়া এই জাতিরে উদ্ধার করার কেউ নাই। এরলাইগাই তাগো কইতে শুনি হাসিনা ছাড়া বিকল্প কে? তোমরা কেউ যোগ্য না। তোমরা হইলা অপর। তোমরা কেউ যোগ্য না। তখন আন্দোলনকারীরা কইতে থাকে, বিকল্প কে? আমি, তুমি। আবার কইতে শুনি, আমি কে তুমি কে? রাজাকার রাজাকার। কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার।
ফ্যাসিবাদের এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে ওয়াল্টার বেজ্জামান ‘রাজনীতির নান্দনিকীকরণ’ বইলা চিহ্নিত করেছিলেন। ফ্যাসিবাদ আমজনতারে তাগো হক বা প্রকৃত অধিকার তো দেয়ই না, বরং বড় বড় কুচকাওয়াজ, জাতীয় উৎসব, মিলিটারি প্যারেড আর চোখধাঁধানো প্রচারণামূলক সাহিত্যের মইধ্যে দিয়া কেবল ‘নিজেকে জাহির করার মওকা’ তৈয়ার কইরা দেয়। রাজনীতিকে একটি থিয়েটার বানায়া ছাড়ে। ফ্যাসিবাদী সাহিত্যে যুদ্ধের বন্দনা করা হয়; যেমন ফিউচারিস্ট কবিদের অনেকেই চিল্লাইয়া কইতেন, যুদ্ধই হলো দুনিয়ার একমাত্র হাইজিন বা স্বাস্থ্যবিধি! তাগো বয়ানে মেশিনগান হইলো ‘আগুনের অর্কিড’ আর গ্যাস মাস্ক হইলো ‘যান্ত্রিক সৌন্দর্যের’ নিশানা। মানুষ যাতে নিজের বিনাশ বা মউতডারেও একটা আর্ট বা শিল্পকর্ম হিশেবে উপভোগ করতে প্ররোচিত করে। বেঞ্জামিন হুঁশিয়ার করছিলেন, এই নান্দনিকীকরণের আখেরি পরিণতি হলো যুদ্ধ। ফরহাদ মরজাহার কইলেন, ফ্যাসিবাদ মুক্ত করতে হইলে তার রূহানিয়াত থেইকা বাঙালি জাতীয়তাবাদকে বিদায় করতে হইবো। এদেশের সাধারণ মানুষ যে চিন্তা করে তার থেইকা ধার নিতে হইবো। সকল মতকে সম্মান দিতে হইবো। মূলত ফ্যাসিবাদের নিশানা বুঝতে হইতো তার সাহিত্য দেইখা, তার নাটক দেইখা, তার চলচ্চিত্র আর সাংস্কৃতিক এ্যাকটিভিটি দেইখা। তাকে নিবারণ করতে হইবো জনসংস্কৃতির উপস্থাপন দিয়া। ধর্মীয় আদর্শ দিয়া। নাহয় তারা সমাজের হাউন্ট হিশাবে বাইরা ওঠবো।
অন্যদিকে, আমবার্তো ইকো তার ‘উর-ফ্যাসিবাদ’ তত্ত্বে দেখাইছেন, ফ্যাসিবাদ হইলো কতগুলা পরস্পরবিরোধী ধারণার একটি জটলা। এর আসল হাতিয়ার হইলো ‘নিউস্পিক’ বা জবানরে সংকুচন, যাতে মানুষের চিন্তার সীমানাটাই ছোট হয়া যায়। এই সাহিত্যে ‘দুশমনের এক দ্বৈত রূপে’ খাড়া করা হয়। যেইখানে দুশমনরে একই সাথে আজরাইলের মতো শক্তিশালী আর ধূর্ত দেখানো হয়, আবার পরক্ষণেই তারে এক্কেবারে কমজোর আর নচ্ছাড় হিশেবে দেখানো হয়। এর চক্করে পইড়া তাগো সাগরেদরা চিরকাল একটা ঘোরের মইধ্যে পইড়া থাকে। এর পাশাপাশি ঐতিহ্যের অন্ধ উপাসনা, ভিন্নমতের বিরোধিতা বা সমালোচনাকে দেশদ্রোহিতা তকমা দেওয়া, নারীবিদ্বেষী পৌরুষের আস্ফালন আর মৃত্যুর বন্দনা করার মতো বিষয়গুলা এই সাহিত্যের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ফুটাইয়া তোলা হয়। আমরা দেখতে পাই হুমায়ূন আহমদের লেখা ‘তুই রাজাকার’ ধরণের ফ্যাসিস্ট প্রজেক্ট এবং আবুল বারাকাতের ‘মৌলবাদী অর্থনীতি’ জাফর ইকবালের চেতনার রাজনীতি, শাহরিয়ার কবিরের ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটির মতো প্রতিষ্ঠান গইড়া এই প্রজেক্ট আগাইয়া নিছে।
প্রচারণার মাধ্যম হিশেবে ফ্যাসিস্ট শাসনে সাহিত্য, খবরের কাগজ থেইকা শুরু কইরা বাচ্চাদের কার্টুন পর্যন্ত ওপর ছিল কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ। ইতালিতে সাংবাদিকদের তো লাইনে থাকতে বাধ্যতামূলকভাবে ফ্যাসিস্ট দলের খাতায় নাম লেখাইতে হইতো, আর তামাম খবর সাজানো হইতো নেতার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জন্য। এমনকি বাচ্চাদের কমিকস থেইকাও পশ্চিমি হাওয়া দূর করার লাইগা ১৯৩৮ সালে কড়া কানুন পাস কইরা তথাকথিত সাংস্কৃতিক শুদ্ধিকরণ বা ‘উবপড়হঃধসরহধঃরড়হ’-এর কোশেশ করা হয়। এই চালের মকসদ আছিল বাচ্চাদের কচি মনেই ভিন্নমতের প্রতি ঘৃণা এবং সহিংসতার প্রতি এক কিসিমের স্বাভাবিকতা তৈরি কইরা দেওয়া। মুজিবের ফ্যাসিজম থেইকা হাসিনার ফ্যাসিজম কিছুডা ফারাগ আছে। হাসিনা কোনো খবরের কাগজ বন্ধ করে নাই বরং খবরের যন্ত্রগুলারে নিজের বন্দনা করার জন্য কামে লাগাইছে। এইহানে অর্থের লোভ, মরনে ডর, আয়নাঘরের জুলুম কায়েম কইরা তার মিশন বাস্তবায়ন করছে। এতে সহযোগিতা করছে ফ্যাসিস্ট সাহিত্যক, শিল্পী ও সংস্কৃতির কামলারা।
জর্জ অরওয়েল ফ্যাসিবাদের এই ভাষাগত বিকৃতিকে পর্যবেক্ষণ কইরা দেখাইছেন যে, ফ্যাসিবাদী লিখনশৈলী আসলে হাকিকত সত্যরে লুকায়ে রাখার একটা জ্যান্ত কৌশল। যেইখানে ‘গণতন্ত্র’, ‘ফ্রিডম’ বা ‘দেশপ্রেম’-এর মতো শব্দগুলারে খোসা বানায়া নেতার স্বার্থে ব্যবহার করা হয়। তারা উড়ঁনষবঃযরহশ বা দ্বিমুখী চিন্তার বাজিগরি দেখায়া ইতিহাসরে সকাল-বিকাল বদলায়, আর অনুসারীদের বস্তুনিষ্ঠ সত্য বোঝার ক্ষমতা থেইকা বঞ্চিত কইরা রাষ্ট্রীয় প্রোপাগান্ডার কেনা গোলামে পরিণত করে। সমাজের উঁচুতলার মানুষ আর তথাকথিত বুদ্ধিজীবী মহলের এই যে ইমান আর আখলাকের পতন, এইডারে টমাস মান তার ‘ডক্টর ফাউস্টাস’ উপন্যাসে ফাউস্টের মিথ দিয়া চমৎকার কইরা ফুটায়া তুলছেন। হেইখানে দেখানো হইছে কীভাবে জার্মানির শিক্ষিত সমাজ নিজেদের শ্রেষ্ঠ প্রমাণের নেশায় নাৎসিগো দরবারে নিজেদের রূহ বা আত্মাটারে বেইচা দিয়া ইনসানিয়ত হারায়া ফেলছিল। এইহানেও পিনাকি ভট্টাচার্যেও ‘ফুলকুমারি’ ও আসিফ নজরুলের ‘আবদুল্লাহ’ উপন্যাসের মাধ্যমে বাংলাদেশের ফ্যাসিজমের দরজা আলগা কইরা দিছে।
আখেরে এই কথাই কওন লাগে, ফ্যাসিবাদ কেবল বিংশ শতাব্দীর একখান পুরান কিসসা না, এইডা হইলো মগজের এক চিরন্তন খতরনাক ব্যারাম, যা আজো নানা ঢঙে হরেক সমাজে মাথাচাড়া দিয়া ওঠে। যেইভাবে মুজিবের উপর ভর কইরা যাইগা উঠে। সে বিনাস হইলে আবার হাসিনার রূপ ধইরা আজাদির জমিনে লাফাইয়া পড়ে। আজকের এই যে ওসধমব-নধংবফ বা চকমকা চিত্রের কালচার, এইখানে প্রচারণার চালগুলা আরও সূক্ষ্ম আর খতরনাক রূপ নিছে, যা মানুষরে চিন্তাভাবনাহীন পুতুল বানায়া ছাড়ে। ফ্যাসিস্ট সাহিত্য আর মানসিক বৈকল্যের এই যে চিরকেলে রূপ, এইডা আমগো মনে করায়া দেয়, সভ্যতার জিন্দেগি খালি বারুদ আর মিলিটারির জোরে টিকে থাকে না, এইডা টেকে মানুষের আক্কেল-বুদ্ধি, দিলের মহব্বত আর সত্যের পক্ষে বুক চিতায়া দাঁড়ানোর হিম্মতের ওপর। তাই আমগো খাস কাম হইলো, যেই রূপেই নতুন ছদ্মবেশ ধইরা এই ফ্যাসিবাদ আসুক না কেন, তারে পাকড়াও করা আর তার মুখোশ ছিঁড়া ফেলা। কারণ যেইখানে জবান আর কল্পনাকে ধ্বংসের কাজে খাটানো হয়, হেইখানে শেষ পর্যন্ত গোটা সভ্যতারই জান কবজ হয়া যায়!

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.