Header Ads

Header ADS

নজরুল সাহিত্যে ঈদ : বাঙালি সংস্কৃতির নতুন অধ্যায়


নজরুল সাহিত্যে ঈদ : বাঙালি সংস্কৃতির নতুন অধ্যায়
আফসার নিজাম

মুসলিমরা বসবাসের শুরু থেকেই ধর্মীয় অন্যতম অনুসঙ্গ ঈদ উদযাপন করে আসছে। তার পরিসর খুব বেশি বিস্তৃত না হলেও মুসলিমদের জনপরিষর বৃদ্ধি ও সম্পৃক্ততা সাথে সাথে এর ব্যাপ্তিও প্রসারিত হয়েছে। বাঙলার বিভিন্ন প্রান্তে যখন ইসলাম প্রচারকবৃন্দ তাদের অনুসারী বৃদ্ধি করে। সমাজে তাদের অবস্থান মজবুত হয়। ব্যবসা বাণিজ্য, কৃষি ও শিল্প উৎপাদনে সম্পৃক্ত মানুষ ধর্ম গ্রহণ করে এবং এর সাংস্কৃতিক বিষয়বলীকে নিজের করে একটি বৃহৎ সাংস্কৃতিক বলয় নির্মাণ করে। তখন বাংলায় রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্য ক্ষেত্র তৈরি হয়। সেই ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজিকে জনগণ আমন্ত্রণ করে তাদের শাসন ভার গ্রহণ করতে। যদিও তখন প্রজা শোষণকারী গৌর রাজক্ষমতায় অধিষ্ঠ ছিলো। জনগণ তাদের থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছেন। স্বাধীন হতে চেয়েছেন। তাই তারা একজন ন্যায়পরায় ব্যক্তিকে তাদের রাজার আসনে বসানোর আমন্ত্রণ করে এই মুসলিম বীরকে। আর তার আগমনের মধ্য দিয়েই বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।  
বাঙালি মুসলমানদের হাতে ধরে বাংলা সাহিত্য প্রাণ পেলো। জীবনের অন্যান্য অনুসঙ্গ তাদের সাহিত্যে বিরাজ করলেও সাংস্কৃতিকভাবে ঈদকে সেভাবে আমাদের সাহিত্যে অবস্থায় তৈরি করতে পারেননি। মুসলিম রাজ আনুকল্য নিয়ে হিন্দু সাহিত্যিকরা তাদের ধর্মীয় বিষয়াবলীকে বাংলা সাহিত্যে নিয়ে আসলেও মুসলিম সাহিত্যিকগণ প্রেম বিরহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে আসে। এর ফলে স্থানীয় মুসলিম জনগোষ্ঠী কৃষ্টি কালচাল সেভাবে উঠে আসেনি তাদের সাহিত্যে। শত শত বছর ধরে বাঙালী মুসলিম ঈদ উৎযাপন করলেও তার এই বাংলার প্রধান ধর্মীয় উৎসবকে সাহিত্যে রূপ দিতে ব্যর্থ হন। বাঙালি মুসলমানদের তার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত। 
ঊনশ শতকের শেষ দশকে বাঙালি মুসলমানের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ঘটলে মুসলিম মধ্যবিত্তের বিকাশ শুরু হয়। যেহেতু ইংরেজদের দোষর হিশেবে হিন্দু জনগোষ্ঠী আগেই মধ্যবিত্তের অবস্থানে উঠে আসে। এবং বাংলার সকল সেক্টরে তাদের জাল বিস্তার করে। বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত তখন একটু একটু করে সাংস্কৃতিক সচেতনতার মধ্য দিয়ে তাদের সাংস্কৃতিক অনুসঙ্গগুলো পূর্ণরোজ্জিবিত করার দিকে নজর দেন। এ সময় তারা লক্ষ করে সমুখ্য সুযোগ থাকার পরেও সাহিত্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে জীবনকে রূপায়িত করার থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করছেন। এসময় তারা তাগাদা বোধ করে নিজের যাপিত জীবনকে সাংস্কৃতিক পরিমন্ডেলের উপাদান হিশেবে ব্যবহার করার। ধর্ম ও জীবনের বিভিন্নি বিষয়ের মতো বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্ত তার প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদ নিয়ে রচনা করতে শুরু করে সাহিত্য রচনা। কাজী নজরুল ইসলাম এ ধারায় সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কবি। 
বাঙালি মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎস নিয়ে যে সৃজনধারা বর্তমানে প্রবাহমান। তার শুরুর কথাটি আগে যেনে নিতে পারি। ১৯০৩ সালে ২১শে ডিসেম্বর ঈদুল আজহা অনুষ্ঠিত হয়। সেই ঈদে ‘নবনূর’ পত্রিকার প্রথম বর্ষের ডিসেম্বর সংখ্যায় সম্পাদক ‘সৈয়দ এমদাদ আলী’ তার লেখা ‘ঈদ’ নামে একটি কবিতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন‘ ‘ইহাই মুসলিম বাংলার প্রথম ঈদ কবিতা।’ কবিতাটি হলো:
‘কুহেলি তিমির সরায়ে দূরে
তরুণ অরুণ উঠিছে ধীরে
রাঙিয়া প্রতি তরুর শিরে
আজ কি হর্ষ ভরে।
আজি প্রভাতের মৃদুল বায়
রঙে নাচিয়া যেন কয়ে যায়
মুসলিম জাহান আজি একতায়
দেখ কত বল ধরে।’
১৯০৩ সালে প্রথম ঈদ কবিতা প্রকাশ পেলেও সর্বজন বিধৃত সাহিত্য হিশেবে সমাদ্ধৃত হয়ে ওঠেনি। যদিও এই সৃষ্টিসম্ভার ক্রমাগত পূর্ণ হতে থাকে। নজরুইল প্রথম তার গানে ঈদকে মহিমান্বিত করে উপস্থাপন করেন বাঙালি মুসলমানদের সামনে। ‘ও মন রমজানেরই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ গানেই তিনি সংযুক্ত করেন ঈদের ইতিহাস, তার তাৎপর্যসমূহ। এই গানে তিনি সাম্য ন্যায় ও ইনসাফ কায়েম করে আনন্দের ফোয়ারা বইয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন। নজরুল কখনই শুধু আনন্দ উপভোগ হিশেবে ঈদকে চিহ্নিত করেননি। তাই তার গান ও কবিতায় এসে মিলিত হয়েছে কুরআন ও হাদীসের প্রকৃত তাৎপর্য, মানবিক মূল্যবোধ। কিভাবে তিনি ঈদের বিখ্যাত গানটি লিখলে তার ইতিহাস যেনে নিতে পারি। 
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৩১ সালে গানটি রচনা করেন এবং  লেখার চতুর্থ দিন শিল্পী আব্বাসউদ্দীনের গলায় গানটি রেকর্ড করা হয়। রেকর্ডে দুই মাস পর ঈদের ঠিক আগ মুহূর্তে এই রেকর্ড প্রকাশ করা হয়। এই গান রচনার ও সুর করার শানেনজুল লিখেছেন শিল্পী আব্বাসউদ্দীন তার ‘দিনলিপি ও আমার শিল্পী জীবনের কথা’র ১৩৩ নম্বর পৃষ্ঠায়। আব্বাসউদ্দীন লিখেন, ‘‘কাজীদার লেখা গান ইতোমধ্যে অনেকগুলো রেকর্ড করে ফেললাম। তার লেখা ‘বেণুকার বনে কাঁদে বাতাস বিধুর’, ‘অনেক কিছু বলার যদি দুদিন আগে আসতে’, ‘গাঙে জোয়ার এল ফিরে তুমি এলে কই’, ‘বন্ধু আজও মনে পড়ে আম কুড়ানো খেলা’ ইত্যাদি রেকর্ড করলাম। একদিন কাজীদাকে বললাম, ‘কাজীদা, একটা কথা মনে হয়। এই যে পিয়ারু কাওয়াল, কাল্লু কাওয়াল- এরা উর্দু কাওয়ালি গায়, এদের গানও শুনি অসম্ভব বিক্রি হয়। এ ধরনের বাংলায় ইসলামি গান দিলে হয় না? তারপর আপনি তো জানেন কীভাবে কাফের-কুফর ইত্যাদি বলে বাংলার মুসলমান সমাজের কাছে আপনাকে অপাঙ্ক্তেয় করে রাখার জন্য আদাজল খেয়ে লেগেছে এক দল ধর্মান্ধ! আপনি যদি ইসলামি গান লেখেন, তাহলে মুসলমানের ঘরে ঘরে আবার উঠবে আপনার জয়গান’।
কথাটা তার মনে লাগল। তিনি বললেন, ‘আব্বাস, তুমি ভগবতীবাবুকে বলে তার মত নাও। আমি ঠিক বলতে পারব না’। আমি ভগবতী ভট্টাচার্য অর্থাৎ গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সেল-ইনচার্জকে বললাম। তিনি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন, ‘না না না, ওসব গান চলবে না। ও হতে পারে না’। মনের দুঃখ মনেই চেপে গেলাম। এর প্রায় ছয় মাস পর। একদিন দুপুরে বৃষ্টি হচ্ছিল, আমি অফিস থেকে গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সেল ঘরে গিয়েছি। দেখি, একটা ঘরে আশ্চর্যময়ী আর ভগবতীবাবু বেশ রসালো গল্প করছেন। আমি নমস্কার দিতেই বললেন, ‘বসুন, বসুন’। আমি তার রসাপ্লুত মুখের দিকে চেয়ে ভাবলাম, এ-ই উত্তম সুযোগ। বললাম, ‘যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে বলি। সেই যে বলেছিলাম ইসলামি গান দেওয়ার কথা। আচ্ছা; একটা এক্সপেরিমেন্টই করুন না, যদি বিক্রি না হয় আর নেবেন না, ক্ষতি কী’? তিনি হেসে বললেন, ‘নেহাতই নাছোড়বান্দা আপনি, আচ্ছা আচ্ছা, করা যাবে’।
শুনলাম, পাশের ঘরে কাজীদা আছেন। আমি কাজীদাকে বললাম, ভগবতীবাবু রাজি হয়েছেন। তখন সেখানে ইন্দুবালা কাজীদার কাছে গান শিখছিলেন। কাজীদা বলে উঠলেন, ‘ইন্দু, তুমি বাড়ি যাও, আব্বাসের সঙ্গে কাজ আছে’। ইন্দুবালা চলে গেলেন। এক ঠোঙা পান আর চা আনতে বললাম দশরথকে। তারপর দরজা বন্ধ করে আধঘণ্টার ভেতরই লিখে ফেললেন, ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ’। তখনই সুর সংযোগ করে শিখিয়ে দিলেন। পরের দিন ঠিক এই সময় আসতে বললেন। পরের দিন লিখলেন, ‘ইসলামের ঐ সওদা লয়ে এল নবীন সওদাগর’। গান দু’খানা লেখার ঠিক চার দিন পরই রেকর্ড করা হল। কাজীদার আর ধৈর্য মানছিল না। তার চোখেমুখে কী আনন্দই যে খেলে যাচ্ছিল! তখনকার দিনে যন্ত্র ব্যবহার হতো শুধু হারমোনিয়াম আর তবলা। গান দু’খানা আমার তখন মুখস্থ হয়নি। তিনি নিজে যা লিখে দিয়েছিলেন, মাইকের পাশ দিয়ে হারমোনিয়ামের ওপর ঠিক আমার চোখ বরাবর হাত দিয়ে কাজীদা নিজেই সেই কাগজখানা ধরলেন, আমি গেয়ে চললাম। এই হল আমার প্রথম ইসলামি রেকর্ড। শুনলাম; দুই মাস পর ঈদুল ফিতররের সময় গান দু’খানা তখন বাজারে বের হবে। ঈদের বাজার করতে একদিন ধর্মতলার দিকে গিয়েছি। বিএন সেন অর্থাৎ সেনোলা রেকর্ড কোম্পানির বিভূতিদার সঙ্গে দেখা। তিনি বললেন, ‘আব্বাস, আমার দোকানে এস’। তিনি এক ফটোগ্রাফার ডেকে নিয়ে এসে বসলেন, ‘এর ফটোটা নিন তো’। আমি তো অবাক! বললাম, ‘ব্যাপার কী’? তিনি বললেন, ‘তোমার একটা ফটো নিচ্ছি, ব্যস, আবার কী’?
ঈদের বন্ধে বাড়ি গেলাম। ...কলকাতা ফিরে এসে ট্রামে চড়ে অফিসে যাচ্ছি। ট্রামে একটি যুবক আমার পাশে গুনগুন করে গাইছে, ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’। আমি একটু অবাক হলাম। এ গান কী করে শুনল! অফিস ছুটির পর গড়ের মাঠে বেড়াতে গিয়েছি, মাঠে বসে একদল ছেলের মাঝে একটি ছেলে গেয়ে উঠল, ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’। আনন্দে-খুশিতে মন ভরে উঠল। ... ছুটলাম কাজীদার বাড়ি। শুনলাম, তিনি রিহার্সেল রুমে গেছেন। দেখি, দাবা খেলায় তিনি মত্ত। দাবা খেলতে বসলে দুনিয়া ভুলে যান তিনি। আমার গলার স্বর শুনে একদম লাফিয়ে উঠে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন, ‘আব্বাস, তোমার গান কী যে-’ আর বলতে দিলাম না পা ছুঁয়ে তার কদমবুসি করলাম। ভগবতীবাবুকে বললাম, ‘তাহলে এক্সপেরিমেন্টের ধোপে টিকে গেছি, কেমন’? তিনি বললেন, ‘এবার তাহলে আরও ক’খানা এই ধরনের গান...’
নজরুলের ইসলামী গান সম্পর্কে লিখতে গিয়ে আবদুল মুকিত চৌধুরী লিখেন, ‘ইসলাম যে শুধু শান্তি ও প্রেমের নয়; সাহস, শক্তি ও বীর্যের, শুধু আধ্যাত্মিকতার নয়; মানবিকতার, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এবং সমাজ জীবনে ন্যায়ের নিয়ামক ভূমিকার তথা সমাজ বিপ্লবের- সেই বাস্তবতার প্রতিফলন। তারই মহিমাময় প্রতিচ্ছবি তার ইসলামী গান’।  (নজরুল ইসলাম : ইসলামী গান- আবদুল মুকিত চৌধুরী) 
সম্ভবত কাজী নজরুল ইসলাম এককভাবে বাংলা সাহিত্যে ঈদ সম্পর্কিত লিখা লিখেছেন। আর তা ঈদের মৌলিক শিক্ষাসহ। আমরা এক নজরে দেখে নিতে চাই তার লেখা রচনার শিরোনাম- ‘শহীদী ঈদ’, ‘কৃষকের ঈদ’, ‘বকরীদ’, ‘ঈদের চাঁদ’, ‘ঈদ-মোবারক’, ‘কোরবানি’, ‘আজাদ’, ‘জাকাত লইতে এসেছে ডাকাত চাঁদ’ এগুলো তাঁর ঈদের কবিতা। ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’, ‘নতুন ঈদের চাঁদ’, ‘নাই হল মা বসন-ভূষণ এই ঈদে আমার’, ‘চলো ঈদগাহে’, ‘ঈদ ঈদ ঈদ’, ‘ছয় লতিফার ঊর্ধ্বে আমার আরাফাত ময়দান’, 'ঈদের খুশির তুফানে আজ ডাকল কোটাল বান’, ‘ঈদুজ্জোহার তকবির শোনো’, ‘ঈদ মোবারক হো’, ‘ফুরিয়ে এল রমজানেরই মোবারক মাস’, ‘নতুন চাঁদের তকবির, তোরা দেরে জাকাত’, ‘ঈদ মোবারক হোক ঈদ মোবারক হোক’, ঈদুজ্জোহার চাঁদ হাসে ঐ’, ‘দে জাকাত দে জাকাত’, ‘ঈদ মোবারক ঈদ মোবারক’ এগুলো নজরুলের ঈদবিষয়ক গান। আর তিনিই প্রথম ঈদ নিয়ে রচনা করে দুটি নাটিকা ‘ঈদজ্জোহা’ ও ‘ঈদুল ফেতর’।
মহাকবি মূলত তার জনগোষ্ঠীর ইতিহাস লিখেন। তার ধর্ম কৃষ্টি, সংস্কৃতি, সমাজ ব্যাবস্থার অনুসঙ্গ হিশেবে বারবার লিখেন। তিনি তার ধর্মের ভেতর দিয়েই সংস্কৃতিকে নির্মাণ করেন। জনগোষ্ঠীর উৎসব উদযাপনের মাত্রা ও অনিবার্যতার চিহ্ন এঁকে যান। কালজয়ী ও জনপ্রিয় ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ’, ‘ঈদের খুশির তুফানে আজ ডাকল কোটাল বান’, ‘ঈদ মোবারক হো’ লেখার পাশাপাশি কিছু কবিতায় চিত্রকল্প রূপায়ন, মৌলিক স্প্রিট সন্বিবেশ করার যে মুন্সিয়ানা প্রয়োগ করেছে তার স্বাদ গন্ধ আর উচ্ছ্বাস লেগে আছে এসকল কবিতার ভেতর। তিনি লিখেন
 
‘আজিকে এজিদে হাসানে হোসেনে গলাগলি,
দোজখে ভেশতে ফুলে ও আগুনে ঢলাঢলি,
শিরি ফরহাদে জড়াজড়ি।
সাপিনীর মতো বেঁধেছে লায়লি কায়েসে গো,
বাহুর বন্ধে চোখ বুঁজে বঁধূ আয়েশে গো!
গালে গালে চুমু গড়াগড়ি।’
কাজী নজরুল ইসলাম ঈদ বিষয়ক কবিতার মূল প্রবণতাকে চিহ্নিত করেছেন সমসাময়ীক জীবনের মধ্য থেকে। তিনি ইসলামের মৌলিকত্ব, মুসলিম জনগোষ্ঠীর ঐক্য আর ধর্মীয় অনুভূতির মধ্য দিয়ে সাম্য, আত্মোউপলব্ধি, আত্মশুদ্ধি ও মুক্তির আকাঙ্খাকে প্রকাশ করেছেন। ইসলামী এসেন্সকে বাঙালির জীবনবোধের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করেছন। তিনি লিখেছেন ‘নতুন চাঁদ’ কাব্যগ্রন্থের ‘ঈদের চাঁদ’ কবিতায়:
‘‘সিঁড়ি-ওয়ালাদের দুয়ারে এসেছে আজ
চাষা মজুর ও বিড়ি-ওয়ালা; মোদের হিস্সা আদায় করিতে ঈদে
দিল হুকুম আল্লাতা’লা।
দ্বার খোলো সাততলা-বাড়ি-ওয়ালা, দেখো কারা দান চাহে,
মোদের প্রাপ্য নাহি দিলে যেতে নাহি দেবো ঈদগাহে।
আনিয়াছে নবযুগের বারতা নতুন ঈদের চাঁদ,
শুনেছি খোদার হুকুম, ভাঙিয়া গিয়াছে ভয়ের বাঁধ।
মৃত্যু মোদের ইমাম সারথি, নাই মরণের ভয়;
মৃত্যুর সাথে দোস্তি হয়েছে—অভিনব পরিচয়।’’
নজরুল আবিস্কার করলেন দীর্ঘ দেড়শত বছর খ্রিস্টান ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে বাঙালী মুসলমানরা আজ ক্লান্ত, অবসন্ন, বিপর্যস্ত। এমতাবস্থায় তাদের উঠে দাড়ানো হিম্মত আর অবস্থান কোনোটি আর অবশিষ্ট নেই। তিনি বাঙালী মুসলমাদের আযাদির স্বপ্ন দেখাতে চেষ্টা করেন। মুসলমানদের জাগাতে হতে মুসলিম অনসঙ্গগুলোই উপস্থাপন করতে হবে। তিনি বেছে নিয়ে কোরবানি। যার মধ্যে ত্যাগের মহিমা সম্পৃক্ত। মুসলমানরা কোরবানির মধ্যকার অপরিমেয় শক্তি আর সাহসের নিয়ে আজাদির জন্য লড়াই করতে পারবে। এই শক্তি ও সাহস নিয়ে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন আরো বেগবান হবে। তিনি কোরবানী কবিতার মাধ্যমে মুসলমানদের ইতিহাস ঐতিহ্যকে পূর্নরব্যাহার করেছেন। 
ঈদ মুসলমানদের জন্য যেমন আধ্যাত্বিক উৎকর্ষ সাধন তেমনি জাগতিক জীবনের উন্নতি সাধনও এর মধ্যে নিহিত রয়েছে। তাই এই ঈদ সকল মানুষের জন্যই একটি মানবিক উৎসব। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কবিতায় ঈদকে মানবিক মূল্যবোধের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর সাহিত্যে ঈদ মানবতার এবং সহানুভূতির বার্তা ছড়িয়ে দেয়। ইসলামের এ সাম্যবাদী চরিত্রের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে কবি বলেন-
‘ইসলাম বলে, সকলের তরে মোরা সবাই,
সুখণ্ডদুখ সমণ্ডভাগ করে নেব সকলে ভাই,
নাই অধিকার সঞ্চয়ের।’
(ঈদ মোবারক, জিঞ্জির)
‘ডাকাত এসেছে যাকাত লইতে, খোলো বাক্সের চাবি, 
আমাদের নহে, আল্লার দেওয়া ইহা মানুষের দাবী।’
(ঈদের চাঁদ)
‘শত যোজনের কত মরুভূমি পারায়ে গো,
কত বালুচরে কত আঁখি-ধারা ঝরায়ে গো,
বরষের পরে আসিলে ঈদ!
ভুখারির দ্বারে সওগাত বয়ে রিজওয়ানের,
কণ্টক-বনে আশ্বাস এনে গুল-বাগের,
সাকিরে “জা’মের” দিলে তাগিদ।’
(ঈদ মোবারক, জিঞ্জির)
কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কবিতায় ঈদকে এমন একটি উপলক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন যেখানে সকল জাতি, বর্ণের মানুষ একে অপরের সাথে মিলিত হয়ে আনন্দ ভাগ করে নেবে। তার চেতনায় ঈদ মানে বৈষম্যহীন এক সমাজের প্রতিচ্ছবি। তিনি ঈদের দিনে মানুষের হৃদয়ে আনন্দ, সুখ ও শান্তি প্রবাহিত হোক। ঈদ যেমন ধর্মীয় অনুশীলন তেমনি এটি একান্তভাবে সামাজিক ও মানবিক জীবনের অংশ হিসেবে গুরুত্ব পায়। তিনি তার সাহিত্যে ঈদের সময়টিকে সকল ভেদাভেদ ও বাধা অতিক্রম করার এক অপূর্ব সময় হিসেবে চিত্রিত করেছেন।
‘জীবনে যাদের হররোজ রোজা ক্ষুধায় আসে না নিদ
মুমূর্ষু সেই কৃষকের ঘরে এসেছে কি আজ ঈদ?
এক বিন্দু দুধ নাহি পেয়ে যে খোকা মরিল তার
উঠেছে ঈদের চাঁদ হয়ে কি সে শিশু-পাজরের হাড়?’
(কৃষকের ঈদ, নতুন চাঁদ)
‘চাহি না ক’ গাভী দুম্বা উট,
কতটুকু দান? ও দান ঝুট।
চাই কোরবানি, চাই না দান।
রাখিতে ইজ্জত ইসলামের
শির চাই তোর, তোর ছেলের,
দেবে কি? কে আছ মুসলমান?’
(শহীদি ঈদ, ভাঙার গান)
কবি আরো খোলসা করে বলে ওঠেন-
‘মনের পশুরে কর জবাই,
পশুরাও বাঁচে, বাঁচে সবাই।
কশাই- এর আবার কোরবানি!-
আমাদের নয়, তাদের ঈদ,
বীর-সুত যারা হ’ল শহীদ,
অমর যাদের বীরবাণী।’
(শহীদি ঈদ, ভাঙার গান)
‘আল্লার নামে, ধর্মের নামে, মানব জাতির লাগি
পুত্রেরে কোরবানি দিতে পারে, আছে কেউ হেন ত্যাগী?’
(বক্রীদ, শেষ সওগাত)
কাজী নজরুল ইসলামের এই কবিতায় ঈদের মাধ্যমে সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও বন্ধুত্বের বার্তা প্রেরণ করা হয়েছে। তাঁর কবিতা ঈদকে শুধু উৎসব হিসেবে নয়, বরং সমাজের ঐক্য, সুখ ও শান্তির উদযাপন হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তৎকালীন বাঙালি মুসলমানদের সকল প্রকার হীনম্নন্যতা আর জড়তাকে পেছেনে ফেলে আত্মপরিচয়ে উৎযিবিত করার জন্য ঈদকে অনুষঙ্গ হিশেবে ব্যবহার করেছেন। তাদের ত্যাগ কোরবানীকে ইতিহাসের ধারায় ফেলে নির্মাণ করতে চেয়েছেন একটি সাম্যবাদী সমাজ, ইনসাফপূর্ণ রাষ্ট্রবাবস্থা। পরবর্তীতে আমরা আযাদী অর্জন করি। নির্মাণ করি একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র।






কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.