Header Ads

Header ADS

অলৌকিক ঐতিহ্য ও আত্মজাগরণের কবি ফররুখ আহমদ ।। আফসার নিজাম

ফররুখ আহমদ বিশ শতকের বাংলা কবিতা জমিনে ঐতিহ্যপন্থী মননশীল কবি হিশেবে মশহুর। সমকালীন কাব্যালোচকগণ তাকে ‘মুসলিম রেনেসাঁর কবি’ হিসেবে অভিহিত করেন। তার কাব্যচর্চার মূল মঞ্জিল ও মাকসাদ ছিল ঐতিহ্যের পুনর্নিমাণ এবং আল্লামা ইকবাল ও নজরুলের মতো এক ঘুমন্ত ও দিশেহারা মিল্লাতের আত্মজাগরণের ডাক দেওয়া। কওমকে পুনর্জাগরিত করার এই তামাদ্দুনিক চেতনা তৈয়ার হইছিল মূলত জাতির পরাজয় ও মহব্বতের স্মৃতিকে কেন্দ্র কইরা। তার শৈশব ও কৈশোর জাপন হয় এমন এক জমানায় যখন ব্রিটিশ খ্রিষ্টানদের জুলুম-শোষণ ও দেশীয় বর্ণহিন্দুদের বেইনসাফীর কারণে মুসলমান সমাজ অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। এই পরাধীনতা ও বে-ইনসাফীর পটভূমিতে ফররুখ তার কলমকে কেবল নন্দনতত্ত্বের খেয়ালে সীমাবদ্ধ না রেখে মযলুম কওমের আজাদির লড়াই ও লড়াইয়ের হাতিয়ার হিশেবে কবুল করেছিলেন। এই জন্যই তার কাব্যে ঐতিহ্যের ধারণাটি নিছক অতীতচারিতা না হইয়া এক অলৌকিক প্রেরণা ও রূহানি চেতনার এক অপূর্ব সংমিশ্রণে জারিত হইছে। যা পরাধীন কওমের অন্তরে আজাদি ও খুদীবোধের বীজ বপন করেছিল।


ফররুখ আহমদের কবিতায় ঐতিহ্যের অনুভব অত্যন্ত গভীর ও বহুমাত্রিক। গবেষকদের মতে, তার এই ঐতিহ্য-প্রীতি, অতীতের প্রতি আন্ধা মোহের সাথে তুলনীয় না। তিনি অতীতকে হাজির করেছেন বর্তমানের তকদীর নির্মাণের শক্তিশালী হাতিয়ার রূপে। তার নজরে ইতিহাস একটি চির জিন্দাসত্তা, যার বিবর্তন থাকলেও মউত নাই বরং এই ইতিহাস কালে কালে নয়া আবর্ত সৃষ্টি করে চলেছে। ফররুখ যখন কাব্যক্ষেত্রে আবির্ভূত হন, তখন কাজী নজরুল ইসলাম বাকরুদ্ধ এবং জসীমউদ্দীন ও অন্যান্য কবিদের দাপট বিদ্যমান। এই ক্রান্তিকালে তিনি নিজস্ব একটি কাব্যবয়ান ও রূপকল্প নির্মাণের জরুরত অনুভব করেন। সেই আলোকে তিনি নির্মাণ কারেণ তার কাব্যজগৎ। আমরা খেয়াল করলে দেখতে পাই তার কাব্যে ঐতিহ্যের দুটি প্রধান ধারা মালুম হয়। একটি হইলো ইসলামের ইতিহাস ও তার অলৌকিক আধ্যাত্মিক শক্তি। আর যার ওপর ভর কইরা তার বিয়ান হাজির করে তা হইলো আরব্য-পারস্যের কেচ্ছা-কাহিনি ও তামাদ্দুনিক আবহ। ফররুখ এই দুই ধারাকে তার কবিতা এমনভাবে মসচারাইজ করছেন, আধুনিক ও ঐতিহ্য সমানভাবে উজালা হইয়া উঠছে। তিনি ইয়াকিন করতেন, একটি জাতির সংস্কৃতি বিকাশে তার আসলাফ বা পূর্বপুরুষদের বীরত্বগাঁথা ও নৈতিক আদর্শ সহায়ক শক্তি হিশাবে কাজ করে। বিশেষ কইরা উপনিবেশিত জুলুমের শিকার বাংলার মুসলমানদের হীনম্মন্যতা কাটিয়ে তোলার জন্য। তাই তিনি সিন্দবাদ, হাতেম তায়ী এবং ইসলামের প্রারম্ভিক যুগের গাজীদের চরিত্রকে প্রতীক হিশাবে ব্যবহার করছেন। জগৎজয়ী বীরদের মতো পরাধীন কওম জাগিয়া আজাদির লড়ায়ে শামিল হইতে পারে।

১৯৪৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত ‘সাত সাগরের মাঝি’ ফররুখ আহমদের প্রথম এবং সর্বশ্রেষ্ঠ কাবিতার কিতাব হিমাবে স্বীকৃত। এই কিতাবটি কেবল ১৯টি কবিতার সংকলন নয়, বরং এটি একটি ঘুমন্ত কওমকে জাগিয়ে তোলার বৈপ্লবিক ইশতেহার। কবি এই কিতাবটি হেকিমুল উম্মত মহাকবি আল্লামা ইকবালে শানে উৎসর্গ করেছিলেন, যা তার কাব্যদর্শনের গতিপথ নির্ধারণ করিয়া দেয়। ‘সাত সাগরের মাঝি’ কবিতায় আরব্য উপন্যাসের দুঃসাহসিক নাবিক সিন্দবাদকে মুসলিম জাগরণ, ফতেহ ও আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রতীক হিশাবে কুবল করছেন। এই কিতাবের বিখ্যাত কবিতা ‘পাঞ্জেরি’-তে কবির ব্যাকুল জিজ্ঞাসা, “রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি?/ এখনো তোমার আসমান ভরা মেঘে?/ সেতারা, হেলার এখনো ওঠেনি জেগে?/ তুমি মাস্তলে, আমি দাঁড় টানি ভুলে;/ অসীম কুয়াশা জাগে শূন্যতা ঘেরি।/ রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি?” একটি পরাধীন জাতির মুক্তির আকুলতাকে ফুটিয়ে তোলে। এখানে ‘পাঞ্জেরি’ হইলো সেই রাহবার বা কাণ্ডারির প্রতীক যিনি ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ সমুদ্রে কিশতিকে নিরাপদে কিনারায় নিয়ে যাইতে সক্ষম। ফররুখ এই কবিতায় দেখিয়েছেন, বাঙালি মুসলমানদের হারানো শওকত ও গৌরব পুনরুদ্ধার করতে হলে তাদের সমুদ্রাভিযানের মতো দুঃসাহসী হতে হবে। লড়াই করে মঞ্জিলে পৌঁছাইতে হবে। তিনি ঐতিহ্যের অলৌকিকতাকে দুনিয়াবী সংগ্রামের সাথে যুক্ত কইরা দেখাইছেন সমকালের সংগ্রামে কিভাবে শামিল থাকতে হয়। তাই তার কবিতায় সিন্দবাদের কিশতি কেবল দরিয়ায় ভাসে না, তা ‘নীল দরিয়ায় পূর্ণ চাঁদের মতো’ সমস্ত বাধা ডিঙায় এগিয়ে যায়। গবেষণায় দেখা যায়, ‘সাত সাগরের মাঝি’র শব্দচয়ন ও চিত্রকল্পে এক ধরণের রাজকীয় আভিজাত্য ও অলৌকিক রহস্যময়তা বিরাজমান। কবি এখানে তামাদ্দুনিক আবহ সৃষ্টির জন্য প্রচুর পরিমাণে আরবি, ফারসি ও উর্দু শব্দ ইসতেমাল করছেন, যা বাংলা কবিতার প্রচলিত ধারাকে এক নতুনত্ব প্রদান করেছে। সিন্দবাদ, শাহরিয়ার, দরিয়া, হেরার রাজ তোরণ— এই শব্দগুলো কেবল শব্দ হিশাবে থাকেনি, শব্দগুলো একেকটি শক্তিশালী প্রতীকে রূপান্তরিত হয়ছে।

এই কিতাবে প্রতীক খুব গভীরভাবে প্রথিত হইছে। চিন্তাগুলো সরাসরি না বলে ঘোরাঘুরি করে ফোঁড়ন দিয়েছে ছবির মধ্যে। সিন্দবাদ এখানে ঝুঁকি নেওয়া, হারানো গৌরবের খোঁজ আর জাগরণের ছাপ বহন করে। পাঞ্জেরি হয়ে উঠেছে অন্ধকারে আলো জ্বালানো নেতা বা রাহবার। একটা জাতির সামগ্রিক যাত্রা, তার লড়াই—সব মিলে জমেছে কিশতির ভেতর। আধ্যাত্মিক আর রাজনৈতিক মুক্তি চোখে পড়ে হেরার তোরণে। জীবনের বাধা আর অফুরন্ত সম্ভাবনা মিশে আছে দরিয়া বা সাগরে। স্বাধীনতা আর জয়ের নিশান হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে বিজয়-পতাকা।

ফররুখ আহমদের কবিতাচর্চায় অলৌকিক ঐতিহ্যের ধারণাটি মজবুত দ্বীনি আকিদা ও বিশ্বাসের সাথে মিলেমিশে একাকার। তিনি বিশ্বাস করতেন ইসলাম শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বীন এবং রূহানি শক্তির আধার। তার কবিতায় আল্লাহ প্রতি ইমান, রাসূল সা.’র প্রতি অবিচল আস্থা, ইসলামের প্রতি আত্মসমর্পণ প্রতিফলিত হয়েছে। ফররুখের দৃষ্টিতে ইনসানের জীবনের একমাত্র মাকসাদ হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি ও রেযামন্দি অর্জন এবং বৈরাগ্য সাধন না করেই স্রষ্টার কুদরাত লাভ করা।

ফররুখ আহমদের আধ্যাত্মিক জগতের এক বড় অংশ জুড়ে ছিলেন মাওলানা আবদুল খালেক ছতুরাভী, যিনি ফুরফুরা শরীফের পীর মাওলানা আবু বকর সিদ্দিকীর খলিফা। তার বিখ্যাত ‘সিরাজাম মুনীরা’ কিতাটি এই মোর্শেদের প্রতি উৎসর্গ করেছিলেন। এই কিতাবে রসূলুল্লাহ সা.’র পবিত্র সীরাত, শান এবং তার নবুয়িয়াতের বর্ণনা করেছেন যা সারা জাহানের অন্ধকার দূর করতে সক্ষম। ফররুখের আধ্যাত্মিকতা তাকে সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে এক বিশ্বজনীন ইনসানিয়ত বা মানবতাবাদের দিকে নিয়ে গিয়াছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, ঈমানের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে একজন মুমিন অজেয় হয়ে উঠতে পারে। তার ‘শবে-কদর’ কবিতায় তিনি লাইলাতুল কদরকে ব্যাখ্যা করেছেন এমন এক পবিত্র রাইত হিশাবে যা জাহেলিয়াতের আন্ধার কাটাইয়া হেদায়েতের আলোর ইশারা দেয়। কবি খুলাফায়ে রাশেদীন—আবু বকর, উমর, ওসমান ও আলীর রা. জীবনভিত্তিক আদর্শকে তার কবিতার গতিধারার রাহবার হিশাবে গ্রহণ করেছিলেন। কবিতায় ওমরের আদল ও ফারুকী বীরত্ব এবং আলীর জুলফিকার অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে আপোষহীন লড়াইয়ে প্রতীক হিশাবে হাজির হয়েছে। ঐতিহ্যের এই অলৌকিক ব্যবহার পাঠককে এক ধরণের গায়েবী শৌর্য ও রূহানি প্রশান্তি দান করে।

ফররুখ আহমদের কাব্যচর্চায় আত্মজাগরণ শুধুই আধ্যাত্মিক অর্থে সীমাবদ্ধ না হইয়া সামাজিক ও রাজনৈতিক আজাদির দিকটিও প্রবল ছিলো। তিনি এমন এক জমানায় কবিতাচর্চা শুরু করেন যখন খ্রিস্টিয় জগতের বেইনসাফীর ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে এবং ১৯৪৩ সালের ব্রিটিশদের লুটের কারণে মন্বন্তর হয়। যার ফলে লক্ষ লক্ষ ভারতীয় ইনসান না খেয়ে মরছে। এই কাহত বা দুর্ভিক্ষ ফররুখের কবি-মানসকে গভীরভাবে নাড়া দিছে। তার ‘লাশ’কবিতাটি দুর্ভিক্ষের বিভীষিকাময় দৃশ্যের এক অমর দস্তাবেজ। সেখানে তিনি লিখেছেন ক্ষুধার্ত মানুষের যন্ত্রণার কথা। তিনি দেখিয়েছেন নিষ্ঠুর জালেম ও শোষক শ্রেণি মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্থে দালান গড়ে তোলে। তার আত্মজাগরণের চেতনার মূলে ছিলো এইসকল শোষিত ও নির্যাতিত মযলুম মানুষের হক প্রতিষ্ঠা করা। তিনি আধুনিক জড়বাদী সভ্যতাকে ‘শয়তানি সভ্যতা’হিশাবে অভিহিত করেছেন, এই জড়সভ্যতা মানুষের কুরবানীকে অস্বীকার করে এবং জনতাকে নর্দমার পাশে ফেলে দেয়। ফররুখ ইয়াকিন করতেন, ইসলামের মূল শিক্ষা হইলো আদল, সাম্য ও ইনসাফ। তাই তার আত্মজাগরণের আহ্বান একাধারে দ্বীনি এবং বৈপ্লবিক। তিনি অলস জড়তার বিরুদ্ধে লেখনীকে জেহাদী ভূমিকায় অবতীর্ণ করেছিলেন। তাঁর ‘পাঞ্জেরি’বা ‘সাত সাগরের মাঝি’কবিতার প্রতিটি পংক্তি একটি মৃতপ্রায় কওমকে তাদের সামর্থ্য সম্পর্কে সচেতন করে তোলার প্রয়াস। তিনি তার কবিতায় জোয়ান বা তরুণ সমাজকে আহ্বান জানিয়েছেন বাতেলের শিকল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার জন্য। ইকবালের ‘শাহীন’পাখির মতো তার কবিতায়ও বিহঙ্গ বা স্বর্ণ ঈগল মুক্তির প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কবির ভাষায়, “হে বিহঙ্গ এই জিঞ্জিরে প্রবল আঘাত হানো,/ সাত আকাশের বিয়াবানে ফের উদার মুক্তি আনো”। এই ডাক কেবল রূহানি আজাদির নয়, বরং মানসিক ও রাজনৈতিক গোলামি থেকে মুক্তিরও ডাক।

ফররুখ আহমদের কবিতার চিহ্নিত হওয়ার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য তার স্বতন্ত্র কাব্যভাষা। নজরুলের চিন্তায় আবর্তন করলেও তার প্রভাব কাটিয়ে নিজস্ব একটি ডিকশন তৈরি করতে সক্ষম হয়ছিলেন। গবেষকদের মতে, ফররুখের কবিতায় রোমান্টিকতা ও আধুনিকতার এক অপূর্ব সন্ধিক্ষণ পরিলক্ষিত হয়েছে। তিনি সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতা রচনায় বিশেষ মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন, ‘মুহূর্তের কবিতা’সংকলনে তা পষ্ট হইছে। মধ্য যুগের পুঁথির ভাষায় আধুনিক কালে যখন অচল হইয়া পড়ে তখন আধুনিক কবিতায় পুঁথিরি সিলসিলায় ফররুখ আরবি, ফারসি ও উর্দু শব্দের সার্থক প্রয়োগ বাংলা কবিতায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সমালোচক সৈয়দ আলী আহসান ফররুখের প্রথম দিকের কবিতার সাংগীতিক মূর্ছনার তারিফ করেছেন, যদিও তার পরবর্তী পর্যায়ের কালামগুলোতে তিনি শব্দাতিশয্য লক্ষ্য করেছেন। যদিও ফররুখের ছন্দ সচেতনতার কারণে তার শব্দগুলো জলতরঙ্গের মহিমায় পাঠক হৃদয়কে আলোড়িত করছে। কাব্যনাট্য, মহাকাব্য ও হিজব বা ব্যঙ্গ-কবিতাতেও একই ধরণের মুন্সিয়ানা হাজির করেছেন। আবার ‘হাতেম তায়ী’কিতাবটি একটি মহাকাব্যিক পটভূমিতে রচিত, যেখানে তিনি প্রাচীন ঐতিহ্যের সাথে আধুনিক ভাবনার সমন্বয় ঘটাইছেন। তার শিশু-কিশোর সাহিত্যের কাজগুলো, যেমন ‘পাখির বাসা’ বা ‘হরফের ছড়া’, তাঁর কবি প্রতিভার বহুমুখিতার সুবুত বা প্রমাণ দেয় তিনি শুধু জুয়ান মানুষের চিন্তার গলিতে বিচরণ করেন না শিশুদের মনোভূমিতেও বিরাজ করেন ।

ফররুখ আহমদ প্রায়ই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে তার রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে। তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের একজন সোচ্চার সমর্থক ছিলেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রই এই অঞ্চলের মুসলিম জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আজাদি নিশ্চিত করতে পারে। এ কারণে অনেক ভারতপ্রেমি ব্রাহ্মণ্যবাদীরা তাকে ‘প্রতিক্রিয়াশীল’হিসেবে চিহ্নিত করার কোশেশ করছেন। তবে গবেষণায় দেখা যায়, ফররুখ আহমদের আদর্শিক অবস্থান ছিলো অত্যন্ত সৎ ও আপোষহীন। তিনি পাকিস্তানের সমর্থক হওয়া সত্ত্বেও ইনসাফের কায়ের লক্ষ্যে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছিলেন এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। গবেষক কাজল রশীদ শাহীন ও ড. মাহবুব হাসানের মতে, ফররুখকে কেবল ‘ইসলামী রেনেসাঁর কবি’হিশাবে দেখা হবে তার প্রতি অবিচার, কারণ তিনি বাংলা ভাষার একজন শক্তিশালী কবি। আহমদ ছফা তাঁর ‘কবি ফররুখ আহমদের কি অপরাধ’প্রবন্ধে কবির প্রতি এই একপেশে মূল্যায়নের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। ফররুখ আহমদের ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার কেবল একটি ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ ছিলো না। তিনি বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব ব্যক্তিত্ব ও পরিচয় সাহিত্যে খোদাই করতে চেয়েছিলেন। তার কবিতা বাদ দেওয়া মানে বাঙালি জাতিসত্তার একটি অনিবার্য সংগ্রামী ইতিহাসকে কেটে ফেলে দেওয়া। তিনি বহুস্বর ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ আওয়াজ হিশাবে তাই আজও প্রাসঙ্গিক।

ফররুখ আহমদের ঐতিহ্যের চেতনা মুসলিম ঐতিহ্যে সীমাবদ্ধ না বরঞ্চ তা বিশ্বজনীন ইনসানিয়তের সাথে সম্পৃক্ত। তিনি বিশ্বাস করতেন যে ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান কেবল মুসলমানদের জন্য না বরং সমগ্র মানবজাতির খায়ের ও কল্যাণের জন্য প্রেরিত হইছে। তাই তার কবিতায় হাতেম তায়ী একটি বিস্ময়কর চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হইছে, যা সততা, মহব্বত এবং নিঃস্বার্থ কুরবানির প্রতীক। হাতেম তায়ীর মাধ্যমে তিনি দেখাইছেন মাখলুকের সেবা করাই হলো খালেকের সন্তুষ্টি লাভের শ্রেষ্ঠ উপায়।

কবির বর্ণাঢ্য কর্মজীবন ও রাজনৈতিক তৎপরতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে ছিলেন এবং দারিদ্র্যকে বরণ করে নিয়েও তার উসুল বা আদর্শ পরিত্যাগ করেননি। এ কারণেই তার মানবিক চেতনা তাকে নির্যাতিত মানুষের পক্ষে দাঁড়াতে, শোষকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হইতে এবং মানুষের ইজ্জত ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে অনুপ্রাণিত করছিলো। ঠিক তেমনি তার কবিতায় মরুচারিতা, সমুদ্রাভিযান ও আরব্য আবহের যে সমাবেশ ঘটেছিল, তা আসলে একটি সংকীর্ণ পরিবেশ থেকে বেরিয়ে এসে বৃহত্তর দুনিয়ার সাথে সংযুক্ত হওয়ারই এক শৈল্পিক প্রয়াস মাত্র। সর্বপরি আধ্যাত্মিক শক্তির মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি বা তাযকিয়ায়ে নফস অর্জন এবং সেই শক্তির সাহায্যে সমাজ সংস্কার—এটিই ছিলো ফররুখ আহমদের কবিতার মূল সুর। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ চাইলে তার প্রতিপালকের নিকটবর্তী হতে পারে যদি সে তার আহকাম অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করে। এই অলৌকিক বিশ্বাসই তার কবিতাকে এক অপরাজেয় জীবনীশক্তি দান করেছে।

ফররুখ আহমদ আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে সেই শায়েরুন কাবীর যাকে অস্বীকার করা অসম্ভব। তার অলৌকিক ঐতিহ্যবোধ এবং আত্মজাগরণের কবিতাচর্চা কেবল একটি নির্দিষ্ট সময় বা গোষ্ঠীর জন্য সীমাদ্ধ ছিলো না, ছিলো শাশ্বত সত্য ও সুন্দরের অন্বেষণকারী উম্মার জন্য। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে দ্বীনি বিশ্বাস ও ঐতিহ্যকে আধুনিক কবিতার আঙ্গিকে সার্থকভাবে প্রয়োগ করা যায়। তার ‘পাঞ্জেরি’বা ‘সিন্দবাদ’আজও বাংলাভাষি জনগোষ্ঠীকে রাহনুয়াই করে ও পথ দেখায়। বাংলাদেশ যতো বেশি সামনের দিকে অগ্রসর হবে, ফররুখ আহমদ ততো বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবেন তার ইনসাফ কায়েমের লড়াইয়ের কারণে। এজনই তার কবিতায় যে ইনকিলাবী চেতনা ও মানবিক আদর্শের চিত্রায়ন দেখি, তা বর্তমান বিশ্বের নানাবিধ যুদ্ধ, অনাহার এবং অবিচারের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত জরুরি। পরিশেষে এই কথা কইতে পাড়ি, ফররুখ আহমদ আমাদের জাতিসত্তা ও কবিতার একটি অনিবার্য সংগ্রামী ইতিহাসের নাম, একটি মিল্লাতের আত্মার আর্তনাদ এবং সেই সাথে জেগে ওঠার অদম্য সংকল্প। অলৌকিক ঐতিহ্যের এই কাব্যসূফী বাংলা কবিতাকে যে নেয়াতম ও ঐশ্বর্য দান করে গেছেন, তা সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে এবং আগামী প্রজন্মের কবিদের কাছে নিরন্তর প্রেরণার উৎস হিসেবে টিকে থাকবে বইলা আমরা আশা করি।




আফসার নিজাম
সভাপতি, বাংলাদেশ সাহিত্যকেন্দ্র
সম্পাদক, সাময়িকী ও মোলাকাত

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.