Header Ads

Header ADS

সাহস এবঙ জলপাইড্রাগন_আফসার নিজাম

 
সাহস এবঙ জলপাইড্রাগন
আফসার নিজাম


(স্বৈরশাসনের বিপক্ষে অবস্থানকারী ছাত্রদের জন্য)

আমরা অনুভব করতে পারছি একটি সাহস ক্যাটওয়াক করে ধীরে ধীরে উঠে আসছে আমাদের মাঝে। সূর্যালোকের রোদে যেমন করে গাছের ছায়া মাটিতে লম্বা হতে থাকে ঠিক তেমনি আমাদের ভেতরে সাহস বড় হয়ে প্রবেশ করতে থাকে হৃদয়ের ভেতর। সাহসটা পায়ের কাছ থেকে উঠে এসে বুকের মধ্যখানে আসন নেয়। তারপর আরো শক্তি অর্জন করে আমাদের ঘাড়ের শাহরগের মাঝে সঞ্চালিত হয় আর ‘চির উন্নত মম শির’ বলে বুক টান করে দাঁড়ায়। সাহস দাঁড়িয়ে গেলে সকল ভয় উবে গিয়ে ধু ধু প্রান্তর ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না। চোখের প্রিজমে তখন খেলা করে মুক্তির নেশা।

আমাদের মাঝে যে একটা সাহস জন্মেছে সে কথাটা আর গোপন থাকে না। এ কান থেকে ও কান হয়ে মানে মোবাইলে মোবাইলে ছড়িয়ে পড়ে খেলার মাঠ থেকে ছাত্রাবাসে। ছাত্রাবাস হয়ে রাজপথে। রাজপথ থেকে শহর-নগর-গ্রাম-গঞ্জে। গ্রাম তো আর গ্রাম নেই এখন এক একটা গ্রাম মানে এক একটা ছোট শহর। ছোট শহরে আর কোনো কথাই গোপন থাকে না। গোপন কথাগুলোও গোপনীয়তা খুলে বেরিয়ে পড়ে সদর দরজা দিয়ে। তাই সাহসের কথাগুলো ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মুখে মুখে, বুকে বুকে। কারণ তারা সাহস দেখবে। সাহস দেখার জন্যই অপেক্ষা করে আছে। আহা সাহস! প্রিয় সাহস।

হতাশায় ডুবে যাওয়া মানুষগুলো টের পায় সাহস জেগেছে। ঝড়ের মাঝে মেঘনা নদীতে বরিশালের লঞ্চগুলো যখন টালমাটাল অবস্থা ঠিক সেই সময় সারেং লঞ্চটা চরে ঠেকিয়ে দিলে মানুষ যেমন স্বস্তি অনুভব করে আজ তারা ঠিক সেই স্বস্তি অনুভব করে। আর ভয় পেলে মানুষ যেমন শব্দ করে চিৎকার করে। যত ভয় তত বেশি চিৎকার। ভয়কে জয় করার চিৎকার দিয়ে মানুষ বলতে থাকে, ‘সাহস জেগেছে; আমাদের সাহস।’ তখন সাহসের কথা গুঞ্জরিত হতে থাকে অলিতে-গলিতে। গুঞ্জরিত হতে থাকে কিশোর থেকে বৃদ্ধদের কানে কানে।

যুবকেরা সাহসের টের পেয়ে আর ঘরে বসে থাকতে পারে না। তারা বেরিয়ে পড়ে। ঘরের ভেতরে তারা অস্বস্তি অনুভব করে। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যায় বলে মনে হয়। বাইরে বেরিয়ে এক বুক নিশ্বাস নিয়ে জ্বলে ওঠে। জ্বলে ওঠে আর জ্বালাতে থাকে হৃদয়ের আগুনে মুক্তির রাজপথ। আগুনের জোগান দিতে জমি থেকে ছুটে আসে কৃষক, কারখানা থেকে ছুটে আসে শ্রমিক, পাঠশালা থেকে ছুটে আসে শিক্ষার্থীসহ শিক্ষক। আর ছুটে আসে প্রজাতন্ত্রের সকল চাকুরে। কারণ তারাও অপেক্ষা করতে ছিল এমন একটা সাহসের। কবে সে সাহস জেগে উঠবে। কবে মুক্তির নিশান উড়বে। কবে বুক খুলে নিশ্বাস নেবে। কবে মুখ খুলে কথা বলবে, একান্ত কথা; আপন কথা; মনের কথা; তর্কের কথা; প্রতিবাদের কথা; বলা কথা; না বলা কথা। অতঃপর খেলার মাঠ থেকে সাহস ফিরে এলো, খেলাই হয়ে উঠল সাহসের কেন্দ্রবিন্দু। খেলায় খেলায় জমে উঠল খেলা। পুঞ্জীভূত ক্ষোভ আছড়ে পড়ল খেলার মাঠে, খেলার মাঠ হয়ে উঠল রাজনীতির মুক্তমঞ্চ; খেলার মাঠ হয়ে উঠল মুক্তির ক্যাম্প। খেলার মাঠ হয়ে উঠল স্বাধীনতার উড়াল পাখি। খেলার মাঠ হয়ে উঠল স্বাধীনতার ভেতরের স্বাধীনতা।

খেলার মাঠ নিয়ে খেলুড়ের কপালে ভাঁজ হয়। ভাঁজে ভাঁজে জমে ওঠে বিষাক্ত ঘাম। ঘাম মুছতে মুছতে ভাবে ‘খেলার মাঠে নেমে আসল পতনের বৃষ্টি? নেমে আসল খোদার লানত?’ ভাবতে ভাবতেই খেলুড়েরা হারাতে থাকে তাদের মায়াজাল। মায়াজাল ছিঁড়ে যাচ্ছে। মায়াজাল ছিঁড়ছে দেখে খেলুড়েরা জ্ঞানশূন্য হয়। তাদের জ্ঞানে পচন ধরে। পচে পচে জমিনের ওপর পড়ে। জমিন গ্রহণ করে না; জমিন উগলে দেয়; জমি বমি করে। পানি বৃদ্ধি পায়; পানি বন্যা হয়। সূর্য রেগে ওঠে; সূর্য তাদের মাথায় ঢেলে দেয় রাজ্যের তাপ। সে তাপে তাদের মাথার তালু গরম হয়। গরম মাথা জ্ঞানশূন্য হয়। জ্ঞানশূন্য মাথায় প্রস্তুতি নেয় আরো একটি শয়তানি খেলার। খেলার মাঠ থেকেই তাই শুরু হয় তাদের ইবলিশি অপারেশন।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। সন্ধ্যা নামে না যেন প্রজাতন্ত্রে নেমে আসে অন্ধকার শুয়োর। অন্ধকারে খেলা করে ভূতের বাচ্চা। ভূত ভূতের দোস্ত; ভূতেরা ভূতেরা মামাতো ভাই; ভূতেরা ভূতেরা শালাতো ভাই; ভূতেরা ভূতেরা তালতো ভাই। ভূতেরা ভূতেরা মিলিত হয়। এরপরই সারি সারি জলপাইড্রাগনে ভরে যায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রান্তর। জলপাইড্রাগনের গর্জনে কেঁপে ওঠে বইয়ের আলমিরা। কেঁপে ওঠে রোকেয়া হল (অথবা রাবেয়া হল), কার্জন হল, কলাভবন, টিএসসি। কেঁপে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ, কেঁপে ওঠে নজরুলের কবর। আর কেঁপে ওঠে কোমলমতি ছাত্রদের অন্তরাত্মা।

অন্ধকার গিলে খায় আলোর ফোয়ারা। নিজেকে ছাড়া আর কারোই মালুম হয় না। তখন জলপাইড্রাগনের সার্চলাইট জ্বলে ওঠে। জ্বলে ওঠে জলপাইড্রাগনের আগুন চোখ। যেন এখনই জ্বালিয়ে দেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল জ্ঞান। জ্বালিয়ে দেবে আটষট্টি হাজার বর্গমাইল সবুজ। স্তব্ধ করে দেবে ষোলো কোটি মুখের আওয়াজ। আওয়াজকে ড্রাগনজান্তারা খুব বেশি ভয় পায়। আওয়াজ শুনলেই কেঁপে ওঠে তার অন্তরাত্মা। তখন অন্ধ তীরন্দাজের মতো অন্ধকারে তীর চালায় যেন টিকটিকির মতো টিক টিক করে কেউ সত্য উচ্চারণ করতে না পারে। জান্তা জানে সত্যই মিথ্যাকে দূরীভূত করে।

কিন্তু না। ড্রাগনজান্তার বিরুদ্ধে জেগে ওঠে সাহস। সাহসে সাহসে জেগে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর। সাহসেরা গেয়ে ওঠে বিজয়ের গান; সাহসেরা গেয়ে ওঠে মুক্তির গান। সাহস মানুষের মনে সাহস জোগায়। মানুষেরা আড়মোড়া দিয়ে ওঠে। মানুষেরা সাহসে ভর করে ওঠে দাঁড়ায়। মানুষেরা দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করে। মানুষেরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বিক্ষোভে, রাজপথে উত্তাল তরঙ্গ সৃষ্টি হয়; তরঙ্গ সৃষ্টি হয় শহর-নগর-বন্দরে; গ্রাম-গঞ্জে; অলিতে-গলিতে। তখন মিছিলের লাইন দীর্ঘ হয়। বন্ধ হয় স্বৈরশাসনের প্রজাতন্ত্র। গাড়ি চলে না; দোকান খোলে না। ব্যবসা বন্ধ; স্কুল বন্ধ; অফিস বন্ধ; আদালত বন্ধ। রাজপথ দিয়ে তখন টহল দেয় জলপাইড্রাগন। তার ক্রূর শব্দে কেঁপে ওঠে রাজপথ। তখন মিছিলের শব্দও আরো জোরালো হয়। স্লোগানে স্লোগানে কেঁপে ওঠে স্বৈরকুরসি।

ড্রাগনজান্তার ক্ষোভ হয়; গোস্বা হয়; রাগ হয়। তার অহংকারে ঘা লাগে। ঘা লেগে আরো বেড়ে যায় অহংকার। অহংকারে বুকের ছাতি ফেটে বেরিয়ে আসে তার কলিজা; কালো কলিজা। কালো কলিজায় শুভ্রতার কোনো চিহ্ন নেই। নেই কোনো গোলাপের আঁচড় কিংবা প্রিয়তমার কোনো চুমুর চিহ্ন। সে যেন এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। টগবগ করে জ্বলতে থাকে দোজখের কালো আগুন। যে আগুনলাভা ধ্বংস করে দেয় মানুষের সাজানো সভ্যতা। সেই কুৎসিত কলিজা থেকে বেরিয়ে আসে জানোয়ারের হুংকার। তার হুংকারে প্যাঁচা জানোয়ারও হুংকার দেয় প্রজাতন্ত্রের প্রজার ওপর। হুংকার দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাহসের ওপর। ট্যা ট্যা ট্যা শব্দে ভারী হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রান্তর। কাঁদানে গ্যাসে ছেয়ে যায় টিএসসি চত্বর; কাঁদানে গ্যাসের অন্ধকারে ভরে যায় কলাভবন; নীলক্ষেত, ফুলার রোড, দোয়েল চত্বর, শাহবাগ। বিদ্যুৎ নিভে যায়। অন্ধকার গ্রাস করে জ্ঞানের আলো। এ যেন ড্রাগনের কৃষ্ণগহ্বর থেকে নিয়ে আসে অন্ধকার। অন্ধকার দিয়ে ছেয়ে ফেলতে চায় জ্ঞানের জগৎ। প্যাঁচা শাসকের অন্ধকার পছন্দ। সে অন্ধকার ভালোবাসে। অন্ধকার ভালোবেসে অন্ধকার ছড়িয়ে দেয় প্রজাতন্ত্রের ভেতর-বাহির। সেই কৃষ্ণ অন্ধকারে একটুকরো আলো নিয়ে এগিয়ে আসে সাহস। সাহসের সাহস দেখে কুপি নিয়ে এগিয়ে আসে আটষট্টি হাজার বর্গমাইলের প্রজাসকল। এগিয়ে আসে প্রজাতন্ত্রের বৃদ্ধ মা। মায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে প্রতিটি ছাত্র হাতে করে নিয়ে আসে আলোর মশাল। এক এক করে জ্বলে ওঠে মশাল। মশালে মশালে আলোকিত হয় জ্ঞানের জমিন। আলোর মিছিল দেখে ভয় পায় অন্ধকার। আলো তার শত্রু। তখন অন্ধকার অন্ধকারকে শিস দেয়। ড্রাগন-শীৎকারে নোংরা হয় পরিবেশ। নোংরা দেখে শুয়োর যেমন আনন্দ পায় তেমনি নোংরা শীৎকারে আনন্দ পায় ড্রাগনজান্তা। তাদের মুখ শীৎকার করে। চোখ শীৎকার করে। পা শীৎকার করে। আর হাতের মেশিনগান চিৎকার করে ওঠে। মেশিনগানের চিৎকার আলোর অগ্রপথিকের দিকে ছুটে আসে। ঠিক তখনই বাতাসের সকল শিকল ছিঁড়ে নপুংসক শাসকের একটি বুলেট ঢুকে যায় সাহসের বুকে। বুলেটের প্রবেশ পথ দিয়ে বেরিয়ে আসে তপ্ত লহু; মুক্তির লহু; স্বাধিকারের লহু; গণতন্ত্রের লহু। লাল হয়ে ওঠে শুভ্র জামা। জামা পরম আদরে গ্রহণ করে শুষে নেয় মুক্তির লাল লহু। সাহসের বুকে বুলেট দিয়ে কিছুটা শান্ত হলেও আবার শুরু করে ড্রাগন আওয়াজ। সেই আওয়াজ আকাশ তোলপাড় করে তোলে। আকাশের মালিককে যেন জানিয়ে দিতে চায় বুলেটই শক্তির মূল উৎস।

আমরা ছুটে যাই নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে। কাঁধে তুলে নিই সাহস। সাহসে ভর করে আমরা কলাভবনের সিঁড়ি দিয়ে উঠে যাই ওপরে। স্বৈর বুটগুলো আমাদের অনুসরণ করে কুকুরের মতো। আর সাহসের লাল রক্ত দেখে হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে আসে। আমরাও সন্তর্পণে সাহসকে শুইয়ে দিই কলাভবনের দোতলার একেবারে শেষ রুমের বারান্দার ওপর। যেন মায়ের কোলে ঘুমিয়ে থাকে সাহস। তারপর বই খাতা ছিঁড়ে গায়ের ওপর বিছিয়ে দিই ফুলের পাপড়ির মতো যেন কোনোভাবেই বুঝতে না পারে জলপাইড্রাগনের ক্রুদ্ধ চোখ।

সাহসকে পরম যত্নে রেখে আমরা লুকিয়ে পড়ি নিরাপদ আশ্রয়ে। কারণ প্রতি মুহূর্তে জলপাইড্রাগন চোখ খুঁজে ফিরছে সাহস। যেন কোনো প্রকারেই মানুষের সাহস বৃদ্ধি না পায়। তাই তারা আমাদের অনুসরণ করে খুঁজে নেয়। বুটের শব্দে কলাভবনের বারান্দা কেঁপে ওঠে। হাজার হাজার অন্ধকারেও সেই বুটের আওয়াজ সন্ত্রস্ত করে তোলে বারান্দা। তারপর হঠাৎ করেই ড্রাগনটর্চগুলো জ্বলে ওঠে একসাথে। যেন দোজখি আলো গ্রাস করে নেয় তামাম বারান্দা। বুটের শব্দে শব্দে এগিয়ে আসে ড্রাগন পা। আর হুমড়ি খেয়ে পড়ে সাহসের ওপর।

বাতাসে বইয়ের ছেঁড়া পাতা সরে গেলে সাহসের মুখের ওপর আলোর বন্যা এসে পড়তেই বিদ্যুতের মতোই উজ্জ্বল আলো ছড়াতে থাকে সাহসের চেহারা। তখন ভয় পেয়ে যায় জলপাইড্রাগন। পিছিয়ে আসে আর একসাথে ট্যা ট্যা ট্যা আওয়াজ তুলে ঝাঁঝরা করে দেয় সাহসের অবশিষ্ট দেহ। তখন দেহের অবশিষ্ট রক্তের নহর শরীর থেকে বের হয়ে শিক্ষাঙ্গনকে মুক্তির স্বাদ দিতে দিতে এগিয়ে যায় সিঁড়ির দিকে। জলপাইড্রাগন তাদের অগ্নিহাসি দেয়। অগ্নিহাসি মানুষের বুকে লাগে। মানুষ কেঁদে ওঠে। কেঁদে ওঠে মা, কেঁদে ওঠে বোন, কেঁদে ওঠে ভাই, কেঁদে ওঠে আত্মীয়-অনাত্মীয় প্রজাতন্ত্রের সকল বনি আদম।

অগ্নিহাসি শেষে জলপাইড্রাগনের সাঁড়াশি হাত সাহসের একটি পা ধরে নির্দয়ভাবে সিঁড়ি দিয়ে টানতে টানতে নিচে নামাতে থাকলে আমরা আমাদের ভেতরে আবার সাহস অনুভব করতে থাকলাম।

২টি মন্তব্য:

Blogger দ্বারা পরিচালিত.