Header Ads

Header ADS

বাংলাদেশের সামাজিক অবস্থানে নারীর সক্ষমতা ।। আফসার নিজাম


বাংলাদেশের সামাজিক অবস্থানে নারীর সক্ষমতা
আফসার নিজাম

বাংলাদেশের সামাজিক অবস্থানে নারীর ক্ষমতায়ন একটি বহুমুখি উন্নয়নমূলক ধারণা, যা কেবল একটি তাত্ত্বিক পরিভাষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই নারী জাতীয় অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর রাষ্ট্রের সংবিধানে নারী-পুরুষের সমানাধিকারের যে অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছিলো, তা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন নীতি, আইন, ধর্মীয় ও সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে একটি দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

নারীর ক্ষমতায়ন বলতে মূলত রাষ্ট্র ও সমাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং তার প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিতকরণকে বোঝায়। গত পাঁচ দশকে নারী শিক্ষার বিস্তারের ফলে নারীরা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছে। আধুনিক শিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষার বিস্তারের কারণে নারীরা পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার, আইনি সক্ষমতা এবং বৈষম্যের বিষয়গুলো সম্পর্কে অধিকতর অবহিত হয়েছে। ফলে তারা ক্ষমতায়নের ধারণাকে বাস্তব জীবনে আত্মস্থ করতে শুরু করেছে। তবে এই অগ্রযাত্রা সম্পূর্ণ বাধাহীন নয়। পশ্চাৎপদ সামাজিক মানসিকতা, কাঠামোগত বৈষম্য এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা নারীর সামাজিক অবস্থানকে এখনও চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দেয়। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর “নতুন বাংলাদেশ” গঠনের যে রাজনৈতিক সংস্কারের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, সেখানে নারীর ক্ষমতায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিষয় হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।

রাষ্ট্রের সর্বস্তরে নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করার সাংবিধানিক ভিত্তি বাংলাদেশের সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। বিশেষ করে সংবিধানের ২৭, ২৮ এবং ২৯ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র ও জনজীবনের সকল ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার এবং বৈষম্যহীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। ২৮(৪) অনুচ্ছেদে সরকারকে নারী, শিশু এবং সমাজের অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর অগ্রগতির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের সাংবিধানিক বৈধতা দেওয়া হয়েছে। এই ইতিবাচক বৈষম্যমূলক নীতির ভিত্তিতেই পরবর্তীতে নারীর উন্নয়ন ও সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা প্রণীত হয়েছে। এরপাশাপাশি বাংলাদেশে নারীর অধিকার সুরক্ষায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১। এটি মূলত ১৯৯৭ সালের নীতিমালার একটি সম্প্রসারিত ও আধুনিক সংস্করণ, যেখানে নারীর সামগ্রিক ক্ষমতায়নের জন্য ৪৯টি নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই নীতির মূল দর্শন ছিলো নারীকে কেবল উন্নয়নের সুবিধাভোগী হিসেবে না দেখে বরং উন্নয়নের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। রাজনীতি, প্রশাসন ও অর্থনীতিতে নারীর সমঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই ছিলো এর অন্যতম লক্ষ্য। তবে উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তির অধিকারের বিষয়টি এখনো ধর্মীয় আইনের কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হয়। পরিতাপের বিষয় হলো, আইনগত কাঠামোর দিক থেকে বাংলাদেশে নারীর সুরক্ষার জন্য বহু আইন থাকলেও সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগ সব সময় নিশ্চিত হয় না। বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা, সামাজিক চাপ এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তার অভাব প্রায়ই নারীর ন্যায়বিচার প্রাপ্তিকে জটিল করে তোলে। তবুও এসব নীতি ও আইন সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক পরিবর্তন সৃষ্টি করেছে, যেখানে নারীর অধিকারকে ক্রমশ একটি মৌলিক নাগরিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে।

অর্থনৈতিক সক্ষমতা নারীর সামাজিক ক্ষমতায়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। গত তিন দশকে বাংলাদেশের নারীরা ঘরোয়া পরিবেশের গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় ও বৈশ্বিক শ্রমবাজারে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করেছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ২০২৪-২৫ সালের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণের হার ৪২.৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্য। এই অগ্রগতির পেছনে প্রধান দুটি ক্ষেত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রথমত, তৈরি পোশাক শিল্প। বর্তমানে এই শিল্পে কর্মরত প্রায় ৪০ লক্ষ শ্রমিকের মধ্যে প্রায় ৫৫ শতাংশই নারী। দ্বিতীয়ত, ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থা। ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে অনেক নারী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। পোল্ট্রি খামার, গবাদি পশু পালন এবং বিভিন্ন কুটির শিল্পের মাধ্যমে তারা আয়ের নতুন পথ সৃষ্টি করেছে। এই অর্থনৈতিক সক্ষমতা নারীর পারিবারিক অবস্থানেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক সহিংসতার হার কমেছে এবং সন্তানদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের সুযোগ বেড়েছে। ফলে পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও নারীর ভূমিকা বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে বাল্যবিবাহের প্রবণতা কিছুটা কমেছে এবং নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশের আরেকটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য হলো শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে লিঙ্গসমতা অর্জন। বিশেষ করে মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের শিক্ষার হার অনেক ক্ষেত্রে ছেলেদের তুলনায় বেশি। এই ঘটনাকে অনেকেই একটি “নীরব বিপ্লব” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বর্তমানে নিম্ন মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের পড়াশোনা সম্পন্ন করার হার প্রায় ৮৪.৭ শতাংশ, যেখানে ছেলেদের হার প্রায় ৬৩.৯ শতাংশ। সরকারের উপবৃত্তি কর্মসূচি এবং দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা এই অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। শিক্ষার প্রসারের ফলে নারীদের স্বাস্থ্য সচেতনতা বেড়েছে এবং মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাসে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। তবে বর্তমান সময়ে নারীর সামাজিক ক্ষমতায়ন এক নতুন যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। শিক্ষা ও অর্থনীতিতে অর্জিত সাফল্যকে টেকসই করতে হলে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা জরুরি। এই প্রেক্ষাপটে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

প্রথমত: আইনি সংস্কার ও বিচার নিশ্চিতকরণ। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং মামলা নিষ্পত্তির সময়সীমা নির্ধারণ করা জরুরি। একই সঙ্গে উত্তরাধিকার আইনে নারীর ন্যায্য অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার বিষয়ে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত: অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য ও ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধি করা। তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং এবং উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর পেশায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা উচিত।

তৃতীয়ত: রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও সংস্কার প্রয়োজন। সংরক্ষিত আসনের পরিবর্তে সরাসরি নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য ৩০ থেকে ৩৩ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন বাধ্যতামূলক করা হলে নারীর প্রকৃত রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাবে।

চতুর্থত: দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচির সঙ্গে মাধ্যমিক শিক্ষা উপবৃত্তিকে সমন্বয় করা এবং স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

পঞ্চমত: পরিবার ও সমাজের পর্যায় থেকেই লিঙ্গ-সংবেদনশীল শিক্ষা বিস্তার করা প্রয়োজন। সাংসারিক কাজের ক্ষেত্রে পুরুষদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং নারীদের সমানভাবে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব।

ষষ্ঠত: নারীকে পুরুষের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, বরং সহযোগী হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত। পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্মানের ভিত্তিতেই একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে উঠতে পারে।

সপ্তমত: ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যেও নারীর অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা সম্পর্কে যে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, তা পরিবার ও সমাজে যথাযথভাবে চর্চা করা প্রয়োজন।

২০২৪ সালের আন্দোলনের মাধ্যমে যে নতুন পরিবর্তনের স্বপ্ন সৃষ্টি হয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠী অর্থাৎ নারীর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা অপরিহার্য। যদি নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত না হয়, তবে সেই পরিবর্তন অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। অতএব রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার, এই তিন স্তরে নারীর অধিকারকে করুণা নয়, বরং মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়াই হবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের অগ্রগতির অন্যতম প্রধান শর্ত।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.